শিরোনাম
◈ কারাগারে আওয়ামী লীগ নেতাদের ঈদ ◈ আওয়ামী লীগ নেতারা বিদেশে ঈদ উদযাপন করে ছবি দিচ্ছেন, ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন দেশে থাকা কর্মীরা! ◈ এবার মুক্ত পরিবেশে ঈদ উদযাপন করতে পারছে দেশের মানুষ: মির্জা ফখরুল  ◈ খালেদা জিয়ার পরিবারের ঈদের ছবি পোস্ট করে যা বললেন আসিফ নজরুল ◈ ঈদে কারাবন্দিদের জন্য থাকছে যেসব খাবার ◈ অনেকের ঘরেই আজ ঈদের আনন্দ নেই, অনেক মা সন্তানের জন্য কান্না করছে: জামায়াতে আমির ◈ উপকূলের ঈদ আনন্দ পানিতেই ◈ সুন্দরবন থেকে চলে আসা ৪০ কেজি ওজনের অজগর উদ্ধার! ◈ ঈদের দিনে দুই বাসের সংঘর্ষে প্রাণ গেল ৫ জনের ◈ আমাদের মধ্যে যে ঐক্য তৈরি হয়েছে,‌ সব প্রতিকূলতার সত্ত্বেও সেই ঐক্য অটুট রাখতে হবে : প্রধান উপদেষ্টা

প্রকাশিত : ২৮ মার্চ, ২০২৫, ০৭:০৩ বিকাল
আপডেট : ৩১ মার্চ, ২০২৫, ০১:০০ দুপুর

প্রতিবেদক : নিউজ ডেস্ক

স্থিতিশীলতাই এখন সবচেয়ে জরুরি

মাহফুজ আনাম: সম্পাদক ও প্রকাশক, দ্য ডেইলি স্টার:  সাম্প্রতিক বেশকিছু ঘটনায় এই ভয় তৈরি হচ্ছে যে, আমরা নিজেরাই নিজেদের অবস্থান দুর্বল করছি। সবচেয়ে ক্ষতিকর ঘটনা ঘটেছে সশস্ত্র বাহিনী, বিশেষত সেনাপ্রধানকে নিয়ে। কিছুদিন ধরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে 'ইনফ্লুয়েন্সার'দের একটি মহল সেনাপ্রধানকে ঘিরে আক্রমণাত্মক প্রচারণা চালাচ্ছেন এবং তার অপসারণ দাবি জানাচ্ছেন। কারণ হিসেবে দাবি করা হচ্ছে, তিনি ক্ষমতাচ্যুত সরকারের সময় নিয়োগ পেয়েছিলেন।

প্রাতিষ্ঠানিক পদে নিয়োগ দেওয়া যেকোনো সরকারের নৈমিত্তিক কার্যক্রমের অবিচ্ছেদ্য অংশ। কাজেই, শুধু জুলাই গণঅভ্যুত্থানের আগে নিয়োগ পেয়েছিলেন বলেই সেটাকে প্রশ্নবিদ্ধ করা উচিত নয়—বিশেষ করে সশস্ত্র বাহিনীর মতো একটি জাতীয় নিরাপত্তা রক্ষাকারী প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে।

সাম্প্রতিক এই বিতর্কের সূত্রপাত হয় গণঅভ্যুত্থানে নেতৃত্ব দেওয়া অন্যতম ছাত্রনেতা হাসনাত আব্দুল্লাহর ফেসবুক পোস্ট থেকে। তিনি গত ২১ মার্চ ফেসবুক পোস্টে ১১ মার্চ সেনাপ্রধানের সঙ্গে হওয়া একটি বৈঠকের বিষয়ে লিখেছেন। যেখানে সেনাপ্রধান নাকি বলেছিলেন, ছাত্র-জনতার ওপর সংঘটিত নৃশংসতার দায় স্বীকার এবং অপরাধ, দুর্নীতি ও ক্ষমতার অপব্যবহারকারীদের বহিষ্কার করে 'রিফাইন্ড' আওয়ামী লীগকে আগামী নির্বাচনে অংশগ্রহণের সুযোগ দেওয়া যেতে পারে। হাসনাত তার পোস্টের মাধ্যমে সেনাপ্রধানের এমন প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেন এবং বিষয়টি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তুলে ধরায় স্বভাবতই ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনা শুরু হয়।

এর ফলে নানা প্রশ্ন উঠেছে। যার মধ্যে রয়েছে—ঘটনার ১০ দিন পর কেন এই প্রসঙ্গ তোলা হলো? কেন এই বক্তব্য দলীয় প্ল্যাটফর্মের বদলে হাসনাতের ব্যক্তিগত ফেসবুকে দেওয়া হলো? কেন দলের সহকর্মীদের সঙ্গে আলোচনা না করেই এমন পোস্ট করা হলো?

হাসনাত বয়সে তরুণ হলেও রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব বিবেচনায় এমন একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান ও তার প্রধানকে নিয়ে বিতর্ক তৈরি করলে কী পরিণতি হতে পারে, সেটা তার জানার কথা। এই সুযোগে কিছু ব্যক্তি সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে কুৎসিত, বিপজ্জনক ও অপমানজনক মন্তব্য করেছেন—যার একমাত্র উদ্দেশ্য হতে পারে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করা।

অতীতে আমাদের সশস্ত্র বাহিনীর যত ভুলই থাকুক না কেন, অন্তর্বর্তী সরকারের প্রতি তাদের গুরুত্বপূর্ণ সমর্থন এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় দিনরাত পরিশ্রম অত্যন্ত প্রশংসার দাবিদার। আমাদের বুঝতে হবে, এই কার্যত শর্তহীন সহযোগিতা ছাড়া অন্তর্বর্তী সরকার তাদের কাজ চালিয়ে যেতে পারত না।

সশস্ত্র বাহিনী ক্ষমতা দখল করতে চাইছে বা সেনাপ্রধান ক্ষমতা গ্রহণের পরিকল্পনা করছেন—এই অভিযোগের সঙ্গে বাস্তবতার কোনো মিল নেই। এমনকি এ ধরনের তথ্য বা দূরবর্তী ইঙ্গিতও নেই। বরং এখানে জেনে-বুঝে উসকানি দেওয়ার প্রচেষ্টা লক্ষণীয়। জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান একাধিকবার বলেছেন, সেনাবাহিনী ব্যারাকে ফিরে যাওয়ার অপেক্ষায় এবং অন্তর্বর্তী সরকার যতদিন বলবে, তার বাইরে একদিনও বেশি মাঠে থাকতে চায় না।

তাহলে কেন এত গুরুত্বপূর্ণ একটি প্রতিষ্ঠানের প্রতি এমন হামলা—যারা অতীতেও পাশে ছিল, এখনো আছে? সেনাবাহিনী যদি সত্যিই ক্ষমতা নিতে চাইত, তাহলে ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা পালিয়ে যাওয়ার পর থেকে ৮ আগস্ট ড. ইউনূস শপথ নেওয়ার আগ পর্যন্ত ছিল তাদের মোক্ষম সময়। কিন্তু তারা সেই সময়ে এমন কিছুই করেনি। আমাদের ধারণা, উন্নয়নশীল দেশের খুব কম সেনাবাহিনীই এমন একটি সুযোগ হাতছাড়া করত এবং এ ধরনের সুযোগ হাত ফসকে যেতে দেওয়ার মতো সেনাপ্রধানের সংখ্যাও হাতেগোনা; বিশেষত যখন তাদের বিরুদ্ধে ক্ষমতাসীন সরকারকে উৎখাত করার দায় দেওয়ার কোনো সুযোগ নেই। এই ঘটনায় আমার মনে পড়ে যায় নেপোলিয়ন বোনাপার্টের সেই বিখ্যাত উক্তি—'আমি ফ্রান্সের মুকুটটি মাটিতে পড়ে থাকতে দেখলাম এবং তলোয়ার দিয়ে তুলে নিলাম।' গুরুত্বপূর্ণ ওই তিনদিনে নিঃসন্দেহে বাংলাদেশের সরকার 'মাটিতে পড়ে ছিল'—যা যেকোনো ক্ষমতালোভী সেনাপ্রধানের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার জন্য আদর্শ সময়। জেনারেল ওয়াকার তার নিজের ও প্রতিষ্ঠানের সেই কঠিন পরীক্ষায় সাফল্যের সঙ্গে উত্তীর্ণ হয়েছেন।

প্রধান উপদেষ্টা গত মঙ্গলবার জাতির উদ্দেশে দেওয়া ভাষণে ইঙ্গিত দিয়েছেন, বর্তমান পরিস্থিতিকে অস্থিতিশীল করার অপচেষ্টা চলছে এবং তিনি গুজব ও ভুয়া তথ্য ছড়ানোর ব্যাপারে সবাইকে সতর্ক করেছেন—যা বর্তমান স্থিতাবস্থাকে নষ্ট করতে পারে এবং সম্ভবত ক্ষমতাচ্যুত গোষ্ঠীর পক্ষ থেকেই এসব অপপ্রচার চালানো হচ্ছে। এটা অপ্রত্যাশিত না। কিন্তু যে বিষয়টি আমাদের আরও বেশি উদ্বিগ্ন করছে তা হলো—এই গুজব, ভুয়া তথ্য ও বিকৃত তথ্য ছড়াচ্ছেন এমন কিছু মানুষ, যারা নিজেদের জুলাই গণঅভ্যুত্থানের কর্মী ও সমর্থক বলে দাবি করেন। যখন এই আন্দোলনের নেতৃস্থানীয়রাও একই কাজ করেন, তখন পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়।

এই মুহূর্তে আমাদের সবচেয়ে বেশি দরকার স্থিতিশীলতা। এরপরই আসে ছাত্র-জনতা হত্যার জন্য দায়ীদের বিচারের আওতায় আনা এবং গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের পথে এগিয়ে যাওয়া। শেখ হাসিনা ভারতে পালিয়ে যাওয়ার পর দেশে তাৎক্ষণিক ও আকস্মিক ক্ষমতার শূন্যতা তৈরি হয়েছিল। সরকারের পাশাপাশি কার্যত পুরো প্রশাসনিক কাঠামো—বিশেষত আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী—উধাও হয়ে যাওয়ায় দেশের সার্বিক পরিস্থিতি অস্থির হয়ে পড়ে। এর ফলে অর্থনীতি ও জননিরাপত্তায় যে অনিবার্য প্রভাব পড়ে, তা জনগণের আস্থা আরও কমিয়ে দেয়।

তবে সাত মাসের শাসনামলে ড. ইউনূসের সরকার অর্থনীতিকে স্থিতিশীলতার আবহে আনতে সক্ষম হয়েছেন, যার জন্য তারা প্রশংসার দাবিদার। গত দুই মাস ধরে মূল্যস্ফীতি ১০ শতাংশের নিচে রয়েছে, যা স্বস্তির বিষয়। চলমান রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং উৎপাদন ও সরবরাহ ব্যবস্থা গুরুতর আকারে বিঘ্নিত হলেও জুলাই থেকে ফেব্রুয়ারির মধ্যে রপ্তানি আয় নয় দশমিক ৯৬ শতাংশ বেড়েছে। একই সময়ে রেমিট্যান্সে ২৩ দশমিক আট শতাংশ প্রবৃদ্ধি অত্যন্ত উজ্জ্বল দিক।

তবে এখনো জননিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ রয়ে গেছে।

বর্তমানে দুটি বড় ইস্যু রয়েছে—একটি সংস্কার কার্যক্রমের অগ্রগতি এবং অন্যটি নির্বাচন আয়োজনের সম্ভাবনা। 'সংস্কার আগে না নির্বাচন'—এই বিতর্ককে আমরা আগেই ভ্রান্ত বলে অভিহিত করেছি। আমাদের অবস্থান পরিষ্কার এবং আবারও বলছি—আমাদের দুটোই দরকার এবং ডিসেম্বরের মধ্যেই সেটা করা সম্ভব। ডিসেম্বরের মধ্যে ২০০৮ সালের পর প্রথমবারের মতো একটি সত্যিকারের অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন হওয়া উচিত। সংশ্লিষ্ট সংস্কার কমিশনগুলো ইতোমধ্যে অনেক গুরুত্বপূর্ণ কাজ শেষ করেছে এবং এখন তাদের কাজের ধারাবাহিকতায় 'ঐকমত্য' গঠনের প্রক্রিয়া চলছে। ড. ইউনূসের ঘোষণামতে, এই ঐকমত্যের ভিত্তিতেই হবে জুলাই সনদ—যা ভবিষ্যতে আমাদের রূপান্তরের দিকনির্দেশনা দেবে বলে প্রত্যাশা।

বর্তমানে সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক দল হিসেবে বিএনপির ধারণা, সংস্কার নিয়ে অতিরিক্ত আলোচনা হচ্ছে মূলত নির্বাচন বিলম্বিত করার কৌশল হিসেবে। আমরাও চাই দ্রুততম সময়ে নির্বাচন হোক। কিন্তু, সংস্কারের গুরুত্ব কোনোভাবেই খাটো করে দেখা যাবে না।

বিএনপি ইতোমধ্যে কিছু বিষয়ে সম্মতি দিয়েছে। সেগুলো হলো—

১. কেবলমাত্র অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠানের জন্য ৯০ দিন মেয়াদি তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠন

২. চার বছর মেয়াদি দ্বিকক্ষ বিশিষ্ট সংসদ, যার নিম্নকক্ষে (জাতীয় সংসদ) থাকবে ৪০০ আসন এবং উচ্চকক্ষে (সিনেট) ১০৫ আসন

৩. নারীদের জন্য সংরক্ষিত আসনের সংখ্যা ১০০ করা

৪. সংসদে থাকবেন দুজন স্পিকার—একজন সরকারি দলের, একজন বিরোধী দলের

৫. প্রধানমন্ত্রী হিসেবে টানা সর্বোচ্চ দুই মেয়াদ দায়িত্ব পালনের সুযোগ এবং তারপরে একবার বিরতি দিয়ে পুনরায় নির্বাচিত হওয়ার সুযোগ

এ ছাড়া, আরও অনেক বিষয়ে আংশিক সমঝোতা ইতোমধ্যে হয়েছে।

উপরোক্ত বিষয়গুলো নিয়ে অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক দলের মতামতও প্রায় একই।

তারপরও কি আমরা মনে করি যে সংস্কার এখনো অনেক দূরের বিষয়? উপরোক্ত সংস্কারগুলো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং এ নিয়ে ইতোমধ্যে ঐকমত্য গঠিত হয়েছে বলেই মনে হচ্ছে। অন্যান্য কমিশনের প্রস্তাবিত বিষয়গুলোতেও একই ধরনের ঐকমত্যের ধারা রয়েছে এবং সেগুলোতেও সমঝোতায় পৌঁছানোর জন্যও যথেষ্ট সম্ভাবনা রয়েছে।

আমরা দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি, সংস্কার নিয়ে সমঝোতা এখন অনেকটাই সুসংহত এবং বছরের শেষ নাগাদ নির্বাচন না হওয়ার কোনো যৌক্তিক কারণ নেই। বিষয়টি নিয়ে বিভ্রান্তি সৃষ্টির দায় অন্তর্বর্তী সরকারই। তারা কখনো ডিসেম্বরের কথা বলছে, আবার কখনো বলছে আগামী বছরের জুনের মধ্যে নির্বাচন আয়োজনের কথা। প্রধান উপদেষ্টা তার সাম্প্রতিক ভাষণেও সেটা বলেছেন। এখনই সময় নির্বাচন নিয়ে একটি সুনির্দিষ্ট অবস্থান নেওয়ার। নির্বাচন কমিশনও ইতোমধ্যে জানিয়েছে, তারা ডিসেম্বরে নির্বাচন করতে প্রস্তুত।

তাহলে এই দ্বিধা কেন?

 

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়