শিরোনাম
◈ অনেকের ঘরেই আজ ঈদের আনন্দ নেই, অনেক মা সন্তানের জন্য কান্না করছে: জামায়াতে আমির ◈ উপকূলের ঈদ আনন্দ পানিতেই ◈ সুন্দরবন থেকে চলে আসা ৪০ কেজি ওজনের অজগর উদ্ধার! ◈ ঈদের দিনে দুই বাসের সংঘর্ষে প্রাণ গেল ৫ জনের ◈ আমাদের মধ্যে যে ঐক্য তৈরি হয়েছে,‌ সব প্রতিকূলতার সত্ত্বেও সেই ঐক্য অটুট রাখতে হবে : প্রধান উপদেষ্টা ◈ উৎসবমুখর পরিবেশে বায়তুল মোকাররমে ঈদের প্রথম জামাত অনুষ্ঠিত ◈ ঈদ আনন্দ মিছিলে অংশ নিয়েছেন অসংখ্য মানুষ ◈ জাতীয় ঈদগাহ মাঠে পবিত্র ঈদুল ফিতরের নামাজ আদায় করেছেন প্রধান উপদেষ্টা  ◈ বিজেপির নেতাদের আপত্তিতে ১৭টি দৃশ্য বাদ পড়ছে এই মালয়ালম সিনেমার ◈ রমজানের ওই রোজার শেষে এলো খুশির ঈদ

প্রকাশিত : ২৮ মার্চ, ২০২৫, ০২:৪৫ দুপুর
আপডেট : ৩১ মার্চ, ২০২৫, ০৬:০০ সকাল

প্রতিবেদক : মহসিন কবির

কিছু সংস্কার প্রস্তাবে দ্বিমত বিএনপির, নানা প্রশ্ন

মহসিন কবির: সংবিধান সংশোধনের কিছু প্রস্তাবে দ্বিমত পোষণ করেছে বিএনপি নেতরা। সংবিধান সংশোধনের কিছু প্রস্তাবে নির্বাচিত প্রতিনিধি ক্ষমতা খর্বের প্রস্তাব মানে না বিএনপি। গণতন্ত্রের চরিত্র হারিয়েছে, তাই আগে সংসদ নির্বাচন হওয়া উচিত, গণভোট নির্বাচন নয়। এটা নিয়ে বিভিন্ন জন বিভিন্ন মন্তব্য করেছেন। 

তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থার মেয়াদ চার মাস নির্ধারণ করে এ মেয়াদকালে জাতীয় ও স্থানীয় সরকারের সব নির্বাচন অনুষ্ঠানের বিষয়ে নির্বাচনব্যবস্থা সংস্কার কমিশনের প্রস্তাবেও একমত নয় বিএনপি।

একই সঙ্গে রুটিন কাজের বাইরে অন্য কোনো দায়িত্ব পালনে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সুযোগ নেই বলে মনে করে দলটি। তবে জাতীয় সাংবিধানিক কাউন্সিল (এনসিসি) কর্তৃক তত্ত্বাবধায়ক সরকার প্রধানের নাম চূড়ান্ত করা এবং প্রধান কর্তৃক ২০ জন উপদেষ্টা নিয়োগে বিধানের বিষয়টি নির্বাচিত জাতীয় সংসদ সিদ্ধান্ত নিতে পারে বলে জানিয়েছে বিএনপি।

এ ছাড়া বিএনপি সংবিধানের প্রস্তাবনা পঞ্চদশ সংশোধনীর আগের অবস্থায় বহাল রাখার বিষয়ে মত দিয়েছে। একই সঙ্গে দলটি সংবিধানের মূলনীতি ও রাষ্ট্রের মূলনীতি হিসেবে সংবিধান সংস্কার কমিশনের সুপারিশের সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করে বলেছে, সংবিধানের এ সম্পর্কিত অনুচ্ছেদ ৮, ৯, ১০ ১২-কে পঞ্চদশ সংশোধনীর আগের অবস্থায় ফিরিয়ে নেওয়াই অধিকতর যুক্তিযুক্ত।

এর পাশাপাশি একটি জাতীয় সাংবিধানিক কাউন্সিল গঠনের সঙ্গেও একমত নয় বিএনপি। এ ছাড়া জাতীয় সংসদের মেয়াদ পাঁচ বছর হওয়াই সমীচীন বলে মনে করে দলটি। সংসদ নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার ন্যূনতম বয়স কমিয়ে ২১ বছর করার বিধান চায় না তারা। প্রধানমন্ত্রী থাকাবস্থায় তিনি যে রাজনৈতিক দলের প্রধান ও সংসদ নেতা হতে পারবেন না, এটাতেও বিএনপি একমত নয়।

কারণ এটি সংশ্লিষ্ট রাজনৈতিক দলের সিদ্ধান্তের বিষয় বলে মনে করে দলটি। আইনসভার নিম্নকক্ষের সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্যদের সমর্থনে প্রধানমন্ত্রী মনোনীত হওয়ার বিধানের সঙ্গেও একমত নয়। তবে সংসদের দু’জন ডেপুটি স্পিকারের মধ্যে একজন বিরোধীদল থেকে মনোনীত করায় দলটি একমত।

একই সঙ্গে উচ্চকক্ষের একমাত্র ডেপুটি স্পিকার সরকারি দলের বাইরে থেকে নির্বাচিত হোক, সেটাও চায় বিএনপি। তা ছাড়া কুমিল্লা ও ফরিদপুর নামে নতুন দুটি বিভাগ গঠন করার বিষয়ে একমত হলেও দেশের পুরোনো চারটি বিভাগের সীমানাকে চারটি প্রদেশে বিভক্ত করে প্রাদেশিক শাসনব্যবস্থা চালুর ব্যাপারে দ্বিমত পোষণ করেছে।

গত ৬ মার্চ পাঁচটি সংস্কার কমিশনের ওপর জাতীয় ঐকমত্য কমিশনে জমা দেওয়া বিএনপির মতামত পর্যালোচনা করে এসব তথ্য পাওয়া গেছে। ওইদিন সংবিধান, নির্বাচনব্যবস্থা, দুর্নীতি দমন, বিচার বিভাগ ও জনপ্রশাসন সংস্কার কমিশনের গুরুত্বপূর্ণ ১৬৬টি সুপারিশ স্প্রেডশিটে ছক আকারে দিয়ে দলগুলোর মতামত চেয়েছিল জাতীয় ঐকমত্য কমিশন। ১৩ মার্চের মধ্যে তাদের মতামত দেওয়ার অনুরোধ করা হয়েছিল। বিএনপি মতামত দিতে অতিরিক্ত সময় চেয়ে নেয়। বিএনপির একটি প্রতিনিধিদল ঐকমত্য কমিশনের সহসভাপতি অধ্যাপক আলী রীয়াজের হাতে দলের মতামত জমা দেয়।

এ বিষয়ে বিএনপি স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমেদ জানান, দুর্নীতি দমন সংস্কার কমিশনের ২০টির মতো প্রস্তাবের মধ্যে বিএনপি ১১টিতে সরাসরি একমত। সাত-আটটিতে মন্তব্যসহ নীতিগতভাবে একমত। একটি প্রস্তাবে ভিন্নমত জানানো হয়েছে।

জনপ্রশাসন সংস্কার কমিশনের ২৬টি প্রস্তাবের মধ্যে প্রায় অর্ধেক বিষয়ে তারা একমত, বাকি অর্ধেকের বিষয়ে তাদের মতামত আছে। বিচার বিভাগ সংস্কার কমিশনের সুপারিশগুলোর বিষয়ে প্রায় সব ক্ষেত্রেই বিএনপি একমত পোষণ করেছে। তিনি জানান, সংবিধান সংস্কার কমিনের সুপারিশের বিষয়ে বিএনপি নিজেদের মতামত তুলে ধরে স্প্রেডশিটের সঙ্গে একটি বিস্তারিত প্রতিবেদন সংযুক্ত করেছে।

প্রস্তাবনায় সংবিধানের মূলনীতি অংশে বলা হয়েছে, কমিশন নিম্নোক্ত বিধান অন্তর্ভুক্তির সুপারিশ করছে। ‘বাংলাদেশ একটি বহুত্ববাদী, বহু জাতি, বহু ধর্মী, বহু ভাষী ও বহু সংস্কৃতির দেশ, যেখানে সব সম্প্রদায়ের সহাবস্থান ও যথাযথ মর্যাদা নিশ্চিত করা হবে।’

অন্যদিকে রাষ্ট্রের মূলনীতি অংশে সংবিধানের মূলনীতি ও রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতি হিসেবে ধর্মনিরপেক্ষতা, সমাজতন্ত্র ও জাতীয়তাবাদ এবং এ সংশ্লিষ্ট সংবিধানের ৮, ৯, ১০ ও ১২ অনুচ্ছেদগুলো বাদ দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। উভয় ক্ষেত্রে একমত নয় বিএনপি। দলটি দুই ক্ষেত্রেই বলেছে, অনুচ্ছেদ ৮, ৯, ১০ ও ১২-কে পঞ্চদশ সংশোধনীর আগের অবস্থায় ফিরিয়ে নেওয়াই অধিকতর যুক্তিযুক্ত।

সুপারিশে ‘মৌলিক অধিকার ও স্বাধীনতা’ অংশে বিদ্যমান অধিকারের অনুচ্ছেদগুলোর সংস্কার যেমন বৈষম্য নিষিদ্ধকরণের সীমিত তালিকা বর্ধিতকরণ, জীবনের অধিকার রক্ষায় বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড ও গুম থেকে সুরক্ষা নিশ্চিতকরণ, জামিনে মুক্তির অধিকার অন্তর্ভুক্তকরণ এবং নিবর্তনমূলক আটকসংক্রান্ত বিধান বিলুপ্তির কথা বলা হয়েছে।

এর সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করে বিএনপি বলেছে, প্রস্তাবিত সুপারিশ অনাবশ্যক ও অপ্রয়োজনীয়। বিদ্যমান সংবিধানেই বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড ও গুম থেকে সুরক্ষা এবং শারীরিক অখণ্ডতা ও অঙ্গপ্রত্যঙ্গ রক্ষার বিষয়টি স্বীকৃত (অনুচ্ছেদ ৩২) বিধায় এ সংক্রান্ত নতুন কোনো সংশোধনী অনাবশ্যক।

সংবিধান সংস্কার কমিশনের সুপারিশের ওপর বিএনপির দেওয়া মতামত পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, প্রস্তাবনার আইনসভা অংশে বিএনপি নীতিগতভাবে একমত হয়েছে যে, দ্বিকক্ষবিশিষ্ট একটি আইনসভা থাকবে। তবে উভয় কক্ষের (উচ্চকক্ষ ও নিম্নকক্ষ) মেয়াদ চার বছর করার যে সুপারিশ করা হয়েছে, সেখানে বিএনপি বলেছে- মেয়াদ পাঁচ বছর হওয়া সমীচীন হবে।

অর্থবিল ব্যতীত আইনসভায় নিম্নকক্ষের সদস্যরা নিজ দলের বিপক্ষে ভোট দেওয়ার পূর্ণ ক্ষমতা দেওয়ার প্রস্তাবের সঙ্গে একমত হয়নি বিএনপি। দলটি বিকল্প প্রস্তাব দিয়ে বলেছে, অর্থবিলের পাশাপাশি আস্থা ভোট, সংবিধান সংশোধনী বিল ও রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার প্রশ্ন জড়িত রয়েছে- এমন কোনো বিল ছাড়া অন্য সব বিষয়ে দলের বিপক্ষে ভোট দিলেও সদস্যপদ শূন্য হবে না মর্মে অনুচ্ছেদ ৭০-এ প্রয়োজনীয় সংশোধনী আনা যেতে পারে।

বিএনপির প্রস্তাব আরো বলা হয়, সংবিধান সংশোধনী অংশে সংবিধানের যে কোনো সংশোধনী উভয় কক্ষের দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতায় অনুমোদন এবং গণভোট করার কথা বলা হয়েছে। বিএনপি এর সঙ্গে একমত নয়। দলটি বলেছে, সংবিধানের সব সংশোধনী গণভোটে উপস্থাপন বাস্তবসম্মত নয়।

এক্ষেত্রে অনুচ্ছেদ ১৪২কে ‘পঞ্চদশ সংশোধনীপূর্ব অবস্থায়’ ফিরিয়ে নেওয়াই যথেষ্ট। নিম্নকক্ষে পাস হওয়া বিল উচ্চকক্ষ সুপারিশসহ কিংবা সুপারিশ ছাড়া পুনর্বিবেচনার জন্য নিম্নকক্ষে ফেরত পাঠাতে পারবে- এমন বিধান করা যেতে পারে। জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর নির্বাচিত সংসদ কর্তৃক সংবিধান সংশোধনের মাধ্যমে এসব সংস্কার বাস্তবায়ন করা যেতে পারে।

সুপারিশে রাষ্ট্রপতি অংশে বলা আছে, রাষ্ট্রপতির মেয়াদ হবে চার বছর। রাষ্ট্রপতি সর্বোচ্চ দুইবারের বেশি অধিষ্ঠিত থাকবেন না। এই প্রস্তাবনার সঙ্গে একমত না হওয়া বিএনপি তাদের মতামতে বলেছে, রাষ্ট্রপতির মেয়াদ পাঁচ বছর হওয়া সমীচীন হবে। বিদ্যমান সংবিধানে সর্বোচ্চ দুবারের বেশি রাষ্ট্রপতি পদে অধিষ্ঠিত না থাকার বিধান (অনুচ্ছেদ ৫০(২) থাকায় এ সংক্রান্ত সুপারিশ অপ্রয়োজনীয়।

প্রস্তাবনায় প্রধানমন্ত্রী অংশে বলা হয়েছে, আইনসভার নিম্নকক্ষের সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্যদের সমর্থনে প্রধানমন্ত্রী মনোনীত হবে। এর সঙ্গে একমত নয় বিএনপি। দলটি এক্ষেত্রে বলেছে, প্রধানমন্ত্রী পদে কোনো নির্বাচন হয় না, বিধায় মনোনয়নের প্রশ্নটি অবান্তর।

প্রধানমন্ত্রী অংশে আরো বলা হয়েছে, একজন ব্যক্তি প্রধানমন্ত্রী হিসেবে সর্বোচ্চ দুবার দায়িত্ব পালন করতে পারবেন। তিনি একাধিক্রমে অথবা অন্য যে কোনো উপায়ে দুবারের বেশি প্রধানমন্ত্রী পদে আসীন হতে পারবেন না। সুপারিশ করা এই বিধানের সঙ্গে একমত পোষণ না করে বিএনপি বলেছে, প্রধানমন্ত্রী পদের মেয়াদসংক্রান্ত বিষয়ে ‘কোনো ব্যক্তি একাধিক্রমে তৃতীয়বার প্রধানমন্ত্রী পদে নিয়োগ লাভের যোগ্য বলিয়া বিবেচিত হইবেন না’- এরূপ বিধান করাই যথেষ্ট।

এই অংশে বলা হয়েছে, প্রধানমন্ত্রী থাকাবস্থায় তিনি কোনো রাজনৈতিক দলের প্রধান এবং সংসদ নেতা থাকতে পারবেন না। এর সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করে বিএনপি বলেছে, প্রধানমন্ত্রী দলের প্রধান অথবা সংসদ নেতা পদে কোনো এক বা একাধিক ব্যক্তি অধিষ্ঠিত হবেন কি না, তা একান্তই সংশ্লিষ্ট রাজনৈতিক দলের সিদ্ধান্ত হওয়া উচিত। এক্ষেত্রে সাংবিধানিকভাবে কোনো বিধিনিষেধ আরোপ সংসদীয় গণতন্ত্রের মূল চেতনার পরিপন্থী।

কমিশনের বিচার বিভাগের সুপ্রিম কোর্ট অংশে দেশের সব বিভাগে হাইকোর্ট বিভাগের সমান এখতিয়ারসম্পন্ন হাইকোর্টের স্থায়ী আসন প্রবর্তনের সুপারিশ করা হয়েছে। এ বিষয়ে একমত নয় বিএনপি। দলটি বলেছে, দেশের সব বিভাগে হাইকোর্ট বিভাগের স্থায়ী আসন সংবিধানের মৌলিক কাঠামোর সঙ্গে সাংঘর্ষিক, বিধায় এটি করার সুযোগ নেই। বিকল্প হিসেবে ঢাকার বাইরে অনুচ্ছেদ ১০০-এর অধীনে হাইকোর্ট বিভাগের সার্কিট বেঞ্চ স্থাপন করা যেতে পারে।

প্রস্তাবনায় আপিল বিভাগের বিচারকদের মধ্য থেকে সর্বোচ্চ জ্যেষ্ঠ বিচারককে প্রধান বিচারপতি হিসেবে নিয়োগ প্রদানকে প্রাতিষ্ঠানিকীকরণের একটি বিধান সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত করার কথা বলা হয়েছে। বিএনপি এ প্রস্তাবের সঙ্গে আংশিকভাবে একমত। দলটি বলেছে, ‘ডকট্রিন অব নেসেসিটি’ বিবেচনায় রেখে প্রবীণতম তিনজন বিচারকের মধ্য থেকে প্রধান বিচারপতি নিয়োগের বাধ্যবাধকতা আরোপ করা যেতে পারে।

স্থায়ী অ্যাটর্নি সার্ভিস অংশে সংবিধানের অধীন একটি স্থায়ী অ্যাটর্নি সার্ভিস প্রতিষ্ঠা করার সুপারিশ করা হয়েছে। এর সঙ্গে একমত নয় বিএনপি। দলটি বলেছে, স্থায়ী প্রসিকিউশন সার্ভিসের প্রয়োজনীয়তা থাকলেও তা আইনের মাধ্যমে ও পর্যায়ক্রমে হওয়া সমীচীন।

সাংবিধানিক কমিশনসমূহ অংশে বলা হয়েছে, পাঁচটি সাংবিধানিক কমিশন নিয়ে সংবিধানের একটি ভাগ তৈরি করা, যেখানে প্রতিটি কমিশনের জন্য একটি করে পরিচ্ছেদ থাকবে। এই কমিশনগুলো হচ্ছে মানবাধিকার কমিশন, নির্বাচন কমিশন, সরকারি কর্ম কমিশন, স্থানীয় সরকার কমিশন ও দুর্নীতি দমন কমিশন।

সবকটি কমিশনের গঠন, নিয়োগ, কার্যকাল এবং অপসারণ প্রক্রিয়া একই রকমের হবে। প্রতিটির মেয়াদ হবে চার বছর। এই প্রস্তাবনায় দ্বিমত জানিয়ে বিএনপি বলেছে, ইতোমধ্যে আইনের দ্বারা গঠিত কমিশনগুলোকে (মানবাধিকার কমিশন, দুর্নীতি দমন কমিশন) নতুন করে সাংবিধানিক কাঠামোর আওতায় আনলে প্রায়োগিক ক্ষেত্রে বিস্তর আইনি জটিলতা তৈরির আশঙ্কা রয়েছে।

দলটির মনে করছে, স্থানীয় সরকার কমিশন সংবিধানের মাধ্যমে না করে স্বতন্ত্র আইনের মাধ্যমে করা অধিক সমীচীন। এতে করে যে কোনো প্রায়োগিক জটিলতা দ্রুততার সঙ্গে সমাধান করা যাবে। বিদ্যমান সাংবিধানিক কমিশনসমূহের (নির্বাচন কমিশন, সরকারি কর্ম কমিশন) মেয়াদ পরিবর্তনের আবশ্যকতা নেই।

‘বিবিধ’ অংশে বলা হয়েছে, কেবল এনসিসির সিদ্ধান্তক্রমে রাষ্ট্রপতি জরুরি অবস্থা ঘোষণা করতে পারবেন। জরুরি অবস্থার সময় নাগরিকদের কোনো অধিকার রদ বা স্থগিত করা যাবে না এবং আদালতে যাওয়ার অধিকার বন্ধ বা স্থগিত করা যাবে না।

তাই অনুচ্ছেদ ১৪১(খ) এবং অনুচ্ছেদ ১৪১(গ) বাতিল হবে। এই প্রস্তাবনার সঙ্গে একমত নয় বিএনপি। এক্ষেত্রে দলটি বলেছে, জরুরি অবস্থা জারির সঙ্গে সরকারের নির্বাহী কর্তৃত্বের বিষয়টি অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত বিধায় এ সংক্রান্ত ক্ষমতা সরকার ও সংসদের বাইরে অন্য কোনো কর্তৃপক্ষের কাছে থাকা সংগত নয়। নাগরিকদের কোনো অধিকার রদ বা স্থগিত না করে জরুরি অবস্থা জারির কী উদ্দেশ্য থাকতে পারে, প্রস্তাবিত সুপারিশে তা বোধগম্য নয়।

অন্তর্বর্তী সরকারের গঠিত জনপ্রশাসন সংস্কার কমিশনের ২৬টি প্রস্তাবের বিষয়ে মতামত জানানোর জন্য সব রাজনৈতিক দলকে জানিয়েছে। এ ২৬টি প্রস্তাবের বিএনপি সাতটিতে একমত হয়েছে। ১১ প্রস্তাবে দ্বিমত জানিয়ে নিজেদের মতামত দিয়েছে। এ ছাড়া আট প্রস্তাবে আংশিক একমত বিএনপি।

জনপ্রশাসন সংস্কার কমিশন সংস্কার বাস্তুবায়নের জন্য স্বাধীন ও স্থায়ী জনপ্রশাসন সংস্কার কমিশন গঠনের প্রস্তাব দিয়েছে। এতে একমত বিএনপি। পাশাপাশি দলটি তাদের মতামত তুলে ধরে। দলটি মনে করে, নীতিগতভাবে একমত। জনপ্রশাসন সংস্কার কমিশন সুপারিশগুলোর থেকে সরকার অগ্রাধিকার ভিত্তিতে বাস্তবায়নযোগ্য সংস্কারের তালিকা প্রণয়ন করবে এবং চলমান প্রক্রিয়ায় মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ তা বাস্তবায়নের কার্যক্রম গ্রহণ করবে। এভাবে চলমান সংস্কার প্রক্রিয়ার টেকসই বাস্তবায়নের স্বার্থে যথাসময়ে সরকার নির্বাহী আদেশে একটি স্থায়ী জনপ্রশাসন সংস্কার কমিশন গঠন করার মতামত দেয় বিএনপি।

তথ্য অধিকার আইন ২০০৯ সংশোধন প্রস্তাবে বিএনপি আংশিক একমত হয়েছে। দলটি মনে করে সংশোধনীতে বিএনপি নীতিগত একমত। তবে প্রস্তাবিত সংশোধনী প্রস্তাব আরো পর্যালোচনা করার পরামর্শ দিয়েছে, যা আগামী নির্বাচনের পর জাতীয় সংসদের মাধ্যমে বাস্তবায়ন করার পরামর্শ দিয়েছে।

এদিকে সরকার গঠিত সংস্কার কমিশন বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের কার্যক্রম পর্যবেক্ষণের জন্য জেলা-উপজেলা পর্যায়ে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার নাগরিক ও ছাত্র প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে একটি করে নাগরিক কমিটি করার প্রস্তাব দিয়েছে। এমন প্রস্তাব নাকচ করেছে বিএনপি। দলটির মনে করে, এ ধরনের কমিটি নানা জটিলতা সমস্যার উদ্ভব ঘটাতে পারে। এ কমিটি হলে স্থানীয় পর্যায়ে জনপ্রশাসনের ওপর ব্যাপক অযাচিত রাজনৈতিক খবরদারি বাড়তে পারে।

সংস্কার কমিশন থেকে কুমিল্লা ও ফরিদপুর নামে দুটি আলাদা বিভাগ গঠনের প্রস্তাব দিয়েছে। এতে সরাসরি সম্মতি দিয়েছে বিএনপি। দলটি মনে করে সরকারের নির্বাহী আদেশের মাধ্যমে তা বাস্তবায়ন সম্ভব।

আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণে সুপ্রিম কোর্টের সঙ্গে পরামর্শক্রমে জেলা ম্যাজিস্ট্রেটকে সিআর মামলা অভিযোগগুলো গ্রহণের ক্ষমতা দেওয়ার সুপারিশ করেছে। যাতে নীতিগতভাবে একমত হয়েছে বিএনপি। দলটি মনে করে আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণে রাখতে দুষ্কৃতকারীদের দ্রুত আইনের আওতায় নিচের ক্ষেত্রে এ ধরনের সিদ্ধান্ত জোরালো ভূমিকা পালন করবে।

জুলাই গণঅভ্যুথানে গণহত্যা, ভোট জালিয়াতি, দুর্নীতির অভিযুক্ত কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য স্বাধীন তদন্ত কমিশনের গঠনের জন্য প্রস্তাব করেছে। দলটি নীতিগত তা সমর্থন দিয়ে নিজেদের মতামত দিয়েছে। দলটি মনে করে এই কমিশন গঠনের জন্য নির্বাহী আদেশে করা সম্ভব। তবে প্রস্তাবটির সঙ্গে ফ্যাসিবাদবিরোধী গণতান্ত্রিক আন্দোলনে যারা বাধাগ্রস্ত করেছে, তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য মতামত দেয় দলটি।

বিশ্লেষকরা বলছেন, বাংলাদেশের সংবিধানে সুনির্দিষ্ট করে প্রধানমন্ত্রী পদের মেয়াদ না থাকার কারণে টানা চার মেয়াদ ক্ষমতা আঁকড়ে ছিলেন সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। ক্ষমতায় থেকে তিনি দেশের নির্বাচন ব্যবস্থাকে নানা প্রশ্নের মুখে ফেলেছেন, অন্যদিকে নিজের ক্ষমতাকেই পাকাপোক্ত করেছেন।

রাজনৈতিক বিশ্লেষক ড. আব্দুল আলীম বিবিসি বাংলাকে বলে, কোনো সময়সীমা দিয়ে প্রধানমন্ত্রী পদের শাসন আটকানো না গেলে একদিকে যেমন স্বৈরাচারী সিস্টেম বদল করা যাবে না, অন্যদিকে রাজনীতিতে নেতৃত্বের বিকাশও ঘটবে না।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের কেউ কেউ অবশ্য মনে করেন কোনো দলের মধ্যে যদি অভ্যন্তরীণ গণতন্ত্র চর্চা বজায় থাকে অন্যদিকে শতভাগ নিরপেক্ষ ভোটে যদি প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হন তাহলে বিষয়টি নিয়ে নতুন করে সংস্কার কমিশন বিবেচনা করতে পারে।

নির্বাচন ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক মুনিরা খান বিবিসি বাংলাকে বলেছেন, টানা দুই মেয়াদে একটা প্রধানমন্ত্রী থাকা উচিত না। কিন্তু পরবর্তীকালে সুষ্ঠু ভোটের মাধ্যমে যদি কোনো নেতার দল ক্ষমতায় আসে সেই দলের মধ্যে যদি সুষ্ঠু গণতন্ত্র চর্চা থাকে এবং তিনি যদি গ্রহণযোগ্য নির্বাচনে জয়লাভ করেন, তার পদে বসার অধিকার থাকা উচিত।

বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমেদ বিবিসি বাংলাকে বলেছেন, বর্তমানে বাংলাদেশে যে পাঁচ বছর মেয়াদের বিষয়টি আছে সেটাই স্টান্ডার্ড, আমরা ওভার নাইট পরিবর্তন করে ফেলতে পারবো না।

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়