শিরোনাম
◈ ফিফা র‌্যাংকিংয়ে দুই ধাপ এগিয়েছে বাংলাদশে, পিছিয়েছে ভারত ◈ ঢাকা-দিল্লি সম্পর্ক খারাপ হয়, এমন বক্তব্য পরিহার করার আহ্বান ভারতের প্রধানমন্ত্রীর ◈ এবার মার্কিন পণ্যে পাল্টা ৩৪ শতাংশ শুল্ক আরোপ করল চীন ◈ বিশ্বের মুসলিম দেশগুলো ঐক্যবদ্ধ থাকলে কেউ জুলুম চালাতে পারবে না : ইরান ◈ দেশে ফিরলেন প্রধান উপদেষ্টা ◈ বাংলাদেশের কোনো নির্দিষ্ট দলকে সমর্থন নিয়ে ড. ইউনূসকে যা বলেন মোদি ◈ ড. ইউনূস-মোদি ৪০ মিনিটের বৈঠকে যেসব বিষয়ে আলোচনা করেন ◈ লাশের স্তুপে পরে থাকা কানাই লাল জানালেন সেই নৃশংস গণহত্যার ঘটনা ◈ ৭২ ঘন্টা পর চোখ খুলেছে শিশুটি, এক আসামি গ্রেফতার ◈ থাইল্যান্ডকে ভিসা সহজীকরণসহ যেসব বিষয়ে আহ্বান জানালেন প্রধান উপদেষ্টা

প্রকাশিত : ০৩ এপ্রিল, ২০২৫, ১২:৩৫ দুপুর
আপডেট : ০৫ এপ্রিল, ২০২৫, ০১:০০ রাত

প্রতিবেদক : মহসিন কবির

বাংলাদেশ-চীন-পাকিস্তান কূটনীতি জোরদার, পিছিয়ে ভারত

মহসিন কবির: ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক নানা কারণে টানাপোড়েনের মধ্যে রয়েছে। শেখ হাসিনা সরকার ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর বাংলাদেশ-ভারত কূটনৈতিক সম্পর্কে ‘অবনতি’ হয়েছে। এর জন্য ভারতই দায়ী। 

অন্তর্বর্তী সরকেরের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূস ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির বৈঠক করার জন্য বার বার চেষ্টা করলেও ব্যর্থ হয়েছে। এবার থাইল্যান্ডের রাজধানী ব্যাংককে বিমসটেক সম্মেলনের সাইডলাইনে তাদের বৈঠক হওয়ার কথা রয়েছে। তবে বৈঠকের এখনো ফাইনাল কোন সূচি হয়নি।

প্রধান উপদেষ্টার হাই রিপ্রেজেন্টেটিভ ড. খলিলুর রহমান আজ এই দুই নেতার মধ্যে বৈঠকের সম্ভাবনার ইঙ্গিত দিয়েছেন। বুধবার ঢাকায় ফরেন সার্ভিস একাডেমিতে এক মিডিয়া ব্রিফিংয়ে খলিলুর রহমান বলেন, ‘আমরা ভারতের সঙ্গে এই বৈঠক (দুই দেশের নেতাদের মধ্যে) আয়োজনের অনুরোধ করেছি... এই বৈঠক অনুষ্ঠিত হওয়ার যথেষ্ট সম্ভাবনা রয়েছে’।

বোয়াও ফোরাম ফর এশিয়া বার্ষিক সম্মেলনে যোগদানের জন্য রাষ্ট্রীয় আমন্ত্রণে চার দিনের চীন সফর করেছেন অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূস। চীনের প্রেসিডেন্ট শি চিনপিং, ভাইস প্রিমিয়ার ডিং জুয়েক্সিয়াং এবং ভাইস প্রেসিডেন্ট হান জেংয়ের সঙ্গে প্রধান উপদেষ্টার বৈঠক হয়েছে। বৈঠকে দুই দেশের মধ্যে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক, আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক বিভিন্ন ইস্যু নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়।

দ্বিপক্ষীয় বৈঠক ও বেশ কয়েকটি চুক্তি নিয়ে চীন ও বাংলাদেশ একটি যৌথ সংবাদ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করেছে। এতে দুই দেশের মধ্যে বিদ্যমান বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক আরও জোরদার করার প্রতিশ্রুতি এবং বিভিন্ন ক্ষেত্রে সহযোগিতা সম্প্রসারণের রূপরেখা তুলে ধরা হয়েছে।

প্রধান উপদেষ্টার প্রেস উইং থেকে পাঠানো যৌথ সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে উল্লেখ করা হয়েছে, চীন ও বাংলাদেশের মধ্যে কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপনের ৫০ বছর পূর্তি উপলক্ষে দুই দেশ ঐতিহাসিক বন্ধুত্বকে আরও গভীর করতে এবং রাজনৈতিক আস্থা ও উন্নয়ন কৌশলের সমন্বয় বাড়াতে সম্মত হয়েছে। উভয় দেশ একে অপরের মূল স্বার্থ ও উদ্বেগের বিষয়ে পারস্পরিক সমর্থন পুনর্ব্যক্ত করেছে। চীন বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ না করার নীতি মেনে চলে এবং বাংলাদেশের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব ও আঞ্চলিক অখণ্ডতাকে সম্মান করে। বাংলাদেশও ‘এক চীন’ নীতিতে দৃঢ় প্রতিশ্রুতি ব্যক্ত করেছে।

ড. মুহাম্মদ ইউনূসকে পবিত্র ঈদুল ফিতরের শুভেচ্ছা জানিয়েছেন পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরিফ। সোমবার (৩১ মার্চ) ড. ইউনূসের সঙ্গে ফোনালাপে এই শুভেচ্ছা জানান তিনি। এছাড়া সরকারের প্রধান উপদেষ্টাকে পাকিস্তান সফরের আমন্ত্রণ জানিয়েছেন শেহবাজ। পাকিস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও উপ-প্রধানমন্ত্রী ইসহাক দার আগামী ২২ এপ্রিল বাংলাদেশে আসছেন বলেও জানিয়েছেন তিনি। 

উভয় নেতার এই ফোনালাপে বাংলাদেশের খ্যাতনামা ও কিংবদন্তি কণ্ঠশিল্পী রুনা লায়লার প্রসঙ্গও উঠে এসেছে। সোমবার সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্ম এক্সে দেওয়া এক পোস্টে একথা জানিয়েছেন শেহবাজ শরিফ।

এক্সে দেওয়া ওই পোস্টে পাকিস্তানের এই প্রধানমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূসের সাথে টেলিফোনে মনোরম কথোপকথন হয়েছে। ফোনালাপে পবিত্র ঈদুল ফিতরের শুভেচ্ছা বিনিময় করেছি এবং পাকিস্তান-বাংলাদেশ সম্পর্ক আরও জোরদার করার জন্য আমাদের যৌথ প্রতিশ্রুতি পুনর্ব্যক্ত করেছি।

বাংলাদেশের সঙ্গে শক্তিশালী প্রতিরক্ষা জোট গঠন করতে চায় পাকিস্তান। দুই দেশের সেনাবাহিনীর এক উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে এ ইস্যুতে আলোচনা হয়েছে বলে জানিয়েছে পাকিস্তানের আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদপ্তর (আইএসপিআর)।

এ বছরের ১৫ জানুয়ারি পাকিস্তানের পাঞ্জাব প্রদেশের রাওয়ালপিন্ডি শহরে সেনা সদরদপ্তরে দেশটির সেনাপ্রধান জেনারেল আসিম মুনিরের সঙ্গে বৈঠক হয়েছে বাংলাদেশের সেনাবাহিনীর প্রিন্সিপাল স্টাফ অফিসার (পিএসও) লেফটেন্যান্ট জেনারেল এস এম কামর-উল-হাসানের। আইএসপিআরের বিবৃতি অনুসারে, ওই বৈঠকে দুই কর্মকর্তা এই মর্মে একমত হয়েছেন যে, বাংলাদেশ এবং পাকিস্তান ভাতৃপ্রতিম দেশ এবং বহিঃস্থ শক্তির প্রভাব থাকা সত্ত্বেও দুই দেশের সম্পর্ক অবশ্যই দৃঢ় থাকবে। খবর জিও নিউজ। এছাড়া ও প্রতিরক্ষা সংক্রান্ত বিভিন্ন ইস্যুতে দুই দেশের সেনাবাহিনীর পারস্পরিক আদান-প্রদান, সহযোগিতা ও অংশীদারত্বের মাত্রা বাড়ানোর ব্যাপারেও আলোচনা করেন পাকিস্তানের সেনাপ্রধান এবং বাংলাদেশের পিএসও।

ড. মুহাম্মদ ইউনূসের সেভেন সিস্টার্স নিয়ে করা মন্তব্যকে কেন্দ্র করে ভারতের উত্তর-পূর্ব রাজ্যগুলোতে তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়েছে। এমনকি বাংলাদেশকেই ভেঙে নিজেদের জন্য সমুদ্রপথ তৈরি করার হুমকি দিলেন ত্রিপুরার নেতা তিপ্রা মথা দলের প্রধান প্রদ্যোত মানিক্য।

এছাড়া আসামের মুখ্যমন্ত্রী হেমন্ত বিশ্ব শর্মা ড. ইউনূসের মন্তব্যকে আপত্তিকর বলে অভিহিত করেছেন। অন্যদিকে কংগ্রেস নেতা পবন খেরা একে উত্তর-পূর্ব ভারতের জন্য বিপজ্জনক বলে মন্তব্য করেছেন।

সম্প্রতি সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে পড়া একটি ভিডিওতে দেখা যায়, চীনে চার দিনের সফরের সময় ড. ইউনূস বলেছেন, ‘ভারতের সাতটি রাজ্য, যা পূর্ব ভারত ও সেভেন সিস্টার্স হিসেবে পরিচিত, সেগুলো একেবারে ভূমিবেষ্টিত (ল্যান্ডলকড)। তাদের সমুদ্রে যাওয়ার কোনো পথ নেই।’

তিনি আরও বলেন, ‘বাংলাদেশ এই অঞ্চলের জন্য সমুদ্রের অভিভাবক। এটি এক বিশাল সম্ভাবনা তৈরি করে, যা চীনের অর্থনীতির সম্প্রসারণের সুযোগ এনে দিতে পারে।’

 ড. ইউনূসের এই মন্তব্যের ফলে ভারতের রাজনৈতিক মহলে ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। বিশেষ করে এমন সময়ে, যখন শেখ হাসিনা সরকার ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর বাংলাদেশ চীনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক তৈরি করতে চাইছে।

আসামের মুখ্যমন্ত্রী হেমন্ত বিশ্ব শর্মা বলেছেন, ‘বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকারের এই মন্তব্য খুবই আপত্তিকর এবং নিন্দনীয়। এটি ভারতের কৌশলগত দচিকেনস নেকদ করিডোরের দুর্বলতা নিয়ে প্রচলিত বর্ণনাকে পুনরায় উসকে দিচ্ছে।’

তিনি আরও বলেন, ‘ভারতের মধ্যে এমন কিছু শক্তিও অতীতে এই সংকীর্ণ ভূখণ্ডকে বিচ্ছিন্ন করার পরামর্শ দিয়েছে, যা উত্তর-পূর্বকে মূল ভূখণ্ড থেকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলতে পারে। তাই আমাদের অবশ্যই আরও শক্তিশালী রেল ও সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। বিশেষ করে দচিকেনস নেকদ করিডোরকে বাইপাস করার মতো নতুন রুট তৈরি করতে হবে।’

এদিকে ত্রিপুরার তিপ্রা মথা দলের প্রধান প্রদ্যোত মানিক্য বলেন, ‘ভারতকে এখনই সমুদ্রপথে নিজস্ব সংযোগ তৈরি করতে হবে, যাতে বাংলাদেশ-নির্ভরতা কমানো যায়। ১৯৪৭ সালে ভারতীয় ইউনিয়নের সঙ্গে যুক্ত হওয়ার ইচ্ছা থাকলেও চট্টগ্রাম বন্দর আমাদের হাতছাড়া হয়েছে। এখন এই অস্থায়ী সরকার সমুদ্রের অভিভাবক হওয়ার দাবি করছে, যা হাস্যকর।’

তিনি আরও বলেন, ‘যদি আমরা নতুন অবকাঠামো প্রকল্পের জন্য কোটি কোটি টাকা ব্যয় করতে পারি, তাহলে বাংলাদেশকেই ভেঙে সমুদ্রপথ নিশ্চিত করাই ভালো। চট্টগ্রাম পাহাড়ি অঞ্চলে বসবাসরত বহু ত্রিপুরি, গারো, খাসিয়া ও চাকমা জনগোষ্ঠী নিজেদের ঐতিহ্যবাহী ভূমিতে অত্যন্ত কঠিন পরিস্থিতিতে বসবাস করছে। তাদের অধিকার ও জাতীয় স্বার্থ রক্ষায় এই সুযোগ ব্যবহার করা উচিত।’

কংগ্রেস নেতা পবন খেরা বলেন, ‘বাংলাদেশ চীনকে আমন্ত্রণ জানিয়ে ভারতের বিরুদ্ধে একটি অবরোধ তৈরি করতে চাইছে। আমাদের পররাষ্ট্রনীতি এতটাই দুর্বল যে, যার জন্মের জন্য আমরা অবদান রেখেছিলাম, সেই দেশই এখন আমাদের ঘিরে ফেলার চেষ্টা করছে।’

ভারতের অর্থনৈতিক উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য সঞ্জীব সান্যাল বলেন, ‘ড. ইউনূসের বক্তব্য খুবই কৌতূহলজনক। চীন বাংলাদেশে বিনিয়োগ করতে পারে, কিন্তু তিনি ভারতের উত্তর-পূর্ব রাজ্যগুলোর ভূমিবেষ্টিত অবস্থান নিয়ে কেন কথা বলছেন?’

বাংলাদেশে ভারতের সাবেক হাইকমিশনার বীণা সিক্রি ড. ইউনূসের মন্তব্যকে ‘অত্যন্ত হতাশাজনক’ বলে আখ্যায়িত করেছেন। তিনি বলেন, ‘উত্তর-পূর্ব ভারতের সমুদ্রপথ ব্যবহার নিয়ে ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে আনুষ্ঠানিক চুক্তি রয়েছে। ইউনূসের মন্তব্য এই ঐতিহাসিক বাস্তবতাকে অস্বীকার করে।’

এদিকে, ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি গত ২৬ মার্চ বাংলাদেশের স্বাধীনতা দিবসে ড. ইউনূসকে একটি বার্তা পাঠিয়ে দুই দেশের অংশীদারিত্ব জোরদারের প্রতিশ্রুতি দেন। তবে ড. ইউনূসের এই মন্তব্য সেই কূটনৈতিক প্রচেষ্টাকে নতুন চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলেছে বলেই মনে করছেন ভারত সংশ্লিষ্টরা।

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়