আবছার তৈয়বী, আমিরাত প্রতিনিধি (আবুধাবি থেকে) : মাত্র আর একদিন পর সাঙ্গ হতে চলেছে বিশ্বের অন্যতম বৃহত্তম ইফতার সম্মিলন। সংযুক্ত আরব আমিরাতের বৃহত্তম, মধ্যপ্রাচ্য ও বিশ্বের অন্যতম বৃহত্তম মসজিদ শেখ জায়েদ গ্র্যান্ড মসজিদকে কেন্দ্র করে প্রতি রমজান মাসের প্রথম দিন থেকে শেষ দিনতক এই ইফতার সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয় । শেখ জায়েদ গ্র্যান্ড মসজিদ সেন্টারের তত্ত্বাবধানে ‘আওয়ার ফাস্টিং ইনিশিয়েটিভ’-এর আওতায় রমজান মাসজুড়ে ২১ লাখ প্যাকেটের বেশি ইফতারি বিতরণ করা হয়। তাছাড়া রমজানের শেষ ১০ রাতে ৩০ হাজার জনকে সাহরি বিতরণ করা হয়।
শেখ জায়েদ গ্র্যান্ড মসজিদে ২০০৫ সাল থেকে নিয়মিত রমজান মাসের প্রথম দিন থেকে শেষ দিন পযর্ন্ত পুরো মাসজুড়ে ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সবার জন্য গণইফতারের ব্যবস্থা করা হয়। কেবল করোনাভাইরাস মহামারীর সময় তা স্থগিত ছিল। শুরুর দিকে ২ হাজার মানুষের জন্য গণইফতারের ব্যবস্থা থাকলেও প্রতিবছর তার পরিধি বাড়তে থাকে। বর্তমানে এখানে গড়ে প্রতিদিন ৩৫ থেকে ৪০ হাজার মানুষ ইফতার গ্রহণ করে থাকেন। কিন্তু সাপ্তাহিক ছুটির দিনগুলোতে তা ৬০ হাজার ছাড়িয়ে যায়। গতকাল ২৮ রমজান জুমাতুল বিদা তথা মাহে রমজানের শেষ শুক্রবার হওয়ায় প্রায় ৮০ হাজার মানুষের ইফতারের বন্দোবস্ত করা হয়েছে বলে জানা যায়।
শেখ জায়েদ গ্রান্ড মসজিদে জোহরের পর থেকেই ইফতার গ্রহণ করার জন্য রোজাদারদের আগমন শুরু হয়। কর্তৃপক্ষ বিভিন্ন শ্রমিক নগরী থেকে এখানে আসতে বিনা ভাড়ার বাসের ব্যবস্থা করে থাকে। মসজিদ এলাকায় রয়েছে নারী, শিশু ও বয়স্কদের জন্য ৭০টি শাটল যান এবং ৫০টি হুইল চেয়ারের ব্যবস্থা। বেলা যতই গড়াতে থাকে ততই মসজিদের দিকে ইফতার গ্রহণেচ্ছু গণমানুষের ঢল বাড়তে থাকে। রোজাদার গণমানুষের অংশগ্রহণে একসময় কানায় কানায় ভরে যায় মসজিদেট চারপাশ। ইফতারের বিশাল বিশাল মাঠ এবং সারিগুলোর পাশেই শীতাতপ-নিয়ন্ত্রিত তাঁবুগুলোয় আগে থেকেই ইফতার সামগ্রী মওজুদ রাখা হয়।
মসজিদ চত্বরে প্রবেশ করতে প্রত্যেককেই অটোমেটিক নিরাপত্তা গেইট অতিক্রম করতে হয়। ছয়শ স্বেচ্ছাসেবকের সুশৃঙ্খল বাহিনী উপস্থিত গণমানুষদেরকে আগে থেকেই সারি সারি করে সাজানো ইফতার বাক্সের স্থানে নির্দেশনা দিয়ে নিয়ে যান। ইফতার জোনের পাশেই থাকে পুলিশ, জরুরি চিকিৎসাকর্মী আর বেসামরিক প্রতিরক্ষা বাহিনী সদস্যদের উপস্থিতি।
মসজিদ চারপাশে ১৭ হাজার বর্গমিটার এলাকায় ইফতারের এ বিশাল আয়োজনের জন্য সবুজ রঙের গালিচা বিছিয়ে বসার ব্যবস্থা করা হয়। নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্য ও স্বেচ্ছাসেবকদের সুশৃঙ্খল পরিচালনায় ধাপে ধাপে পুরো আয়োজন সম্পন্ন করা হয়। প্রত্যেকের জন্য ইফতার সামগ্রী হিসেবে থাকে খেজুর, পানি, লাচ্ছি, জুস, দুই ধরণের ফল এবং সালাদসহ স্বাস্থ্যকর খাবারের বাক্স। এই গণইফতার মাহফিলে মুসলমান ছাড়াও সংযুক্ত আরব আমিরাতে অবস্থানরত এবং পর্যটক ভিসায় আগত বিভিন্ন ধর্ম, দেশ ও জাতি-গোষ্ঠির মানুষকেও উৎসাহ ভরে ইফতারে অংশ নিতে দেখা যায়।
সংযুক্ত আরব আমিরাতের প্রতিষ্ঠাতা-প্রেসিডেন্ট ও জাতির জনক শেখ জায়েদ বিন সুলতান আলনাহিয়ানের নামে প্রতিষ্ঠিত এই মসজিদটি বিশ্বের সুন্দর মসজিগুলোর একটি। এই মসজিদ এখন বিশ্বের লাখো ভ্রমণপিপাসু পর্যটকের গন্তব্য হয়ে উঠেছে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে আগত ভ্রমণপিপাসু মানুষরা দৃষ্টিনন্দন স্থাপত্যশৈলীর এই মসজিদটি দেখতে প্রতিদিন ভিড় জমান। দর্শনার্থীর তালিকায় নানা দেশের সাধারণ মানুষজন যেমন থাকে, তেমনি থাকে বিভিন্ন দেশের সরকার ও রাষ্ট্রপ্রধানসহ সরকারি উচ্চ র্পযায়ের কর্মকর্তারাও। শেখ জায়েদ গ্র্যান্ড মসজিদ সেন্টার জানিয়েছে, ২০২৪ সালে মসজিদটিতে ৬৫ লাখ ৮২ হাজার ৯৯৩ জন মুসল্লি ও পর্যটকের আগমন ঘটেছে। এর মধ্যে ৮১ শতাংশই ছিল বিদেশি পর্যটক এবং বাকি ১৯ শতাংশ ছিল আমিরাতের। আর ৫২ শতাংশ পর্যটক ছিল এশিয়ার বিভিন্ন দেশের।
১৯৯৬ সালে শেখ জায়েদ গ্রান্ড মসজিদের নির্মাণকাজ শুরু হয় এবং ২০০৭ সালে ঈদুল আজহায় মসজিদটি উন্মুক্ত করা হয়। প্রায় ৫৪৫ মিলিয়ন ডলার ব্যয়ে নির্মিত মসজিদটির আয়তন পাঁচ লাখ ৫৫ হাজার বর্গমিটার। এখানে একসঙ্গে ৫৫ হাজারের বেশি মানুষ নামাজ আদায় করতে পারে। মসজিদটির ভেতরে রয়েছে ৮২টি সাদা মার্বেলের গম্বুজ, বাইরের এক হাজার ৯৬টি কলাম, প্রতি কলামের ওপরের দিকে স্থানীয় ঐতিহ্যবাহী খেজুর গাছের আদলে র্স্বণখচিত আছে। ভেতরে রয়েছে ৯৬টি মণি খচিত কলাম এবং সাতটি ২৪ ক্যারেট স্বর্ণখচিত ঝাড়বাতি। মসজিদটির মেহরাবের ওপরে এবং দু’পাশে দেয়ালজুড়ে বিশেষ কায়দায় আল্লাহর ৯৯ নাম খচিত আছে। বিশ্বমানের ৩৮টি প্রতিষ্ঠানের প্রায় তিন হাজার শ্রমিক মসজিদটি নির্মাণে কাজ করেছেন।
সংযুক্ত আরব আমিরাতের জাতির পিতা এবং প্রতিষ্ঠাতা-প্রেসিডেন্ট মরহুম শেখ জায়েদ বিন সুলতান আল নাহিয়ানের নামানুসারে মসজিদটির নাম রাখা হয়েছে। তিনিই এই মসজিদ করার পরিকল্পনা করেছিলেন। এই মসজিদ নির্মাণের স্থাপত্যবিষয়ক নির্দেশনা ছিল তাঁরই। ২০০৪ সালে তিনি ইন্তেকাল করার পর মসজিদ চত্বরে তাঁকে কবর দেওয়া হয়। প্রতি ওয়াক্ত নামায শেষে শত শত মানুষ স্বউদ্যোগে তাঁর কবর জিয়ারত করে ফাতিহাখানি পড়েন। সাদা মার্বেল খচিত তাঁর কবরের পাশেই কোরআন তিলাওয়াতের জন্য একটি বিশেষ ঘর নির্মাণ করা হয়। যেখানে হাফেজগণ সুললিত কণ্ঠে পালাক্রমে ২৪ ঘন্টা কোরআন শরীফ তিলাওয়াত করে থাকেন।
শেখ জায়েদ গ্র্যান্ড মসজিদ মধ্যপ্রাচ্যের অন্যতম শীর্ষ সাংস্কৃতিক ও ঐতিহাসিক নিদর্শন হিসেবে স্বীকৃত। পারস্য, মুঘল ও আলেকজান্দ্রিয় স্থাপত্যশৈলীর অনুকরণে নির্মিত শেখ জায়েদ মসজিদে রয়েছে ৫ হাজার ৬২৭ বর্গমিটার আয়তনের বিশ্বের সর্ববৃহৎ গালিচা। যা মসজিদের ভেতরেই তৈরি করা হয়। এই মসজিদে একসাথে ৪০-৫০ হাজার মুসল্লি নামায আদায় করতে পারে। মহিলাদের জন্য রয়েছে আলাদা নামাযের স্থান ও শৌচাগার। এখান থেকে পুরো আবুধাবি শহরের মসজিদগুলোতে বেতার প্রযুক্তির মাধ্যমে একযোগে দৈনিক পাঁচ ওয়াক্ত নামাজের আজান সম্প্রচারিত হয়।
সাদা মার্বেল পাথরে নির্মিত শেখ জায়েদ গ্রান্ড মসজিদের সম্মুখভাগে রয়েছে পানির ফোয়ারা। মসজিদের উঠোন ঘেঁষেই সামনে এবং দু’পাশেই রয়েছে বিশাল বিশাল জলাধার। রাতে আলোর ঝলকানিতে অদূরে দাঁড়িয়ে দেখলে মনে হবে স্বচ্ছ পানির ফোয়ারার মাঝে মসজিদটি সাদা মুক্তার মতো ভাসছে। মসজিদের চারপাশেই রয়েছে সবুজের সমারোহ। বিপূল পরিমাণ খেজুর গাছের সারি আরবের ঐতিহ্য-প্রকৃতির কথাই মনে করিয়ে দেয়। পুরো এলাকা জুড়েই রয়েছে নানা জাতের ফুলের বাগান আর বাহারি সব গাছের বিপূল উপস্থিতি। সবুজ ঘাসে আচ্ছাদিত সাজানো-গোছানো এমন সুন্দর, পরিপাটি, মনোরম ও দৃষ্টিনন্দন প্রাকৃতিক পরিবেশ রোজাদারদের মসজিদটির প্রতি আকৃষ্ট করে বার বার। বিশেষ করে ইফতারের পূর্বে সাঁঝের মৃদু সমীরণ গায়ে লাগা মাত্রই ইফতার করতে আসা রোজাদারেরা স্বর্গীয় অনুভূতি অনুভব করে। ইফতার শেষে সবার গন্তব্য হয় শেখ জায়েদ গ্র্যান্ড মসজিদের অপূর্ব স্থাপত্যশৈলীর নিদর্শনটির দিকেই। মাগরিবের নামাজ শেষে রোজাদার মুসল্লিরা আগ্রহভরে মসজিদটির সৌন্দর্য উপভোগ করে থাকেন। এ সময় স্মৃতি ধরে রাখতে অনেকেই মসজিদটির ভেতরে-বাইরে দাঁড়িয়ে-বসে ছবি তুলে রাখে।
আর একদিন পরেই মাসব্যাপী অন্যতম বৃহত্তম এই গণইফতার সম্মিলন সমাপ্ত হবে। এই গণইফতার আয়োজনের মাধ্যমে মসজিদটির জনপ্রিয়তা দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। এতে প্রতি বছরের মতো এবারও আমিরাতের বিভিন্ন অঙ্গরাজ্যসহ আবুধাবির বিভিন্ন এলাকা থেকে অন্যান্য দেশের অভিবাসীদের পাশাপাশি প্রচুর প্রবাসী বাংলাদেশিদেরও অংশ নিতে দেখা গেছে।