শিরোনাম

প্রকাশিত : ০৬ এপ্রিল, ২০২৫, ০৮:৫৬ সকাল
আপডেট : ০৭ এপ্রিল, ২০২৫, ০১:০০ রাত

প্রতিবেদক : আর রিয়াজ

ট্রাম্পের সঙ্গে ইলনের মতবিরোধ শুল্ক নিয়ে, ট্রাম্পবিরোধী বিক্ষোভে টালমাতাল যুক্তরাষ্ট্র

ডেইলি মেইল: মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের সঙ্গে ইলন মাস্কের মতবিরোধ শুরু হয় শুল্ক আরোপ নিয়ে। ইলন মাস্ক হোয়াইট হাউসের সঙ্গে তার  ভিন্নমতের বিষয়টি জনসমক্ষে প্রকাশও করেন। আর এরই মধ্যে সারা যুক্তরাষ্ট্র জুড়ে ট্রাম্পবিরোধীদের বিক্ষোভ শুরু হয়েছে। 

প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের বিশেষ উপদেষ্টা ইলন মাস্ক একটি রাজনৈতিক সমাবেশে বলেছিলেন যে তিনি একটি মুক্ত বাণিজ্য অঞ্চল তৈরি করতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং ইউরোপের মধ্যে একটি 'শূন্য শুল্ক পরিস্থিতি' দেখতে আশা করছেন।

বুধবার, ট্রাম্প ইউরোপের জন্য একটি বিতর্কিত ২০ শতাংশ শুল্কের সাথে অন্যান্য বৈশ্বিক ব্যবসায়িক অংশীদারদের জন্য আরও বেশি শুল্ক প্রবর্তন করেছেন যাকে তিনি 'মুক্তি দিবস' বলে অভিহিত করেছেন।

তবে ট্রাম্প যখন মার্কিন বিচ্ছিন্নতাবাদকে ঠেলে দিচ্ছেন, তখন মাস্ক আরও সহযোগিতামূলক পদ্ধতির সমর্থন করেছিলেন।

'আমি আশা করি যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং ইউরোপ খুব ঘনিষ্ঠ অংশীদারিত্ব প্রতিষ্ঠা করতে পারে,' টেসলার সিইও ইতালির উপ-প্রধানমন্ত্রী মাত্তেও সালভিনির ভার্চুয়াল সমাবেশে বলেছিলেন।

স্পেসএক্সের প্রতিষ্ঠাতা এও বলেনন, 'আমি আশা করি এটি সম্মত হয়েছে যে ইউরোপ এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র উভয়েরই আমার দৃষ্টিতে শূন্য শুল্ক পরিস্থিতির দিকে আদর্শভাবে এগিয়ে যাওয়া উচিত, কার্যকরভাবে ইউরোপ এবং উত্তর আমেরিকার মধ্যে একটি মুক্ত বাণিজ্য অঞ্চল তৈরি করা উচিত।'

নতুন প্রতিষ্ঠিত ডিপার্টমেন্ট অফ গভর্নমেন্ট এফিসিয়েন্সি (ডিওজিই) থেকে ইলন মা্স্ক পদত্যাগ করবেন বলে ঘোষণার মাত্র কয়েকদিন পরেই মাস্কের ভিন্নমত আসে। 

এদিকে ওয়াশিংটন ডিসিসহ যুক্তরাষ্টের বিভিন্ন শহরে হাজার হাজার বিক্ষোভকারী প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ করেছেন। ধারণা করা হচ্ছে, ডোনাল্ড ট্রাম্প ও তার ধনকুবের সহযোগী ইলন মাস্কের সরকার সংস্কার ও প্রেসিডেন্টের কর্তৃত্ব বাড়ানোর বিরুদ্ধে এটি সবচেয়ে বড় বিক্ষোভ হতে যাচ্ছে।

রয়টার্সের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, শনিবার ওয়াশিংটনে বৃষ্টির মধ্যেও ট্রাম্পবিরোধীরা বিক্ষোভ করেন।

আয়োজকরা রয়টার্সকে জানান, ন্যাশনাল মলে একটি সমাবেশে ২০ হাজারেরও বেশি মানুষ অংশ নেবেন বলে আশা করা হচ্ছে।

ইভেন্টের ওয়েবসাইট অনুযায়ী, প্রায় ১৫০টি অ্যাক্টিভিস্ট গ্রুপ এতে অংশ নিতে নিবন্ধন করেছে। প্রায় ৫০টি অঙ্গরাজ্যে বিক্ষোভের পরিকল্পনা করা হয়েছে।

নিউ জার্সির প্রিন্সটনের অবসরপ্রাপ্ত বায়োমেডিক্যাল বিজ্ঞানী টেরি ক্লেইন ওয়াশিংটন মনুমেন্টের নিচে মঞ্চে জড়ো হয়েছিলেন। তিনি বলেন, অভিবাসন থেকে শুরু করে ডিওজিই কর্মী ছাটাই, এ সপ্তাহে শুল্ক আরোপ, শিক্ষা সবকিছুতে ট্রাম্পের নীতির প্রতিবাদ জানাতে তিনি সমাবেশে যোগ দিয়েছেন।

'আমি বলতে চাইছি, আমাদের পুরো দেশ অস্থিরতার মধ্যে আছে,' বলেন তিনি।

দিনভর চলা বিক্ষোভে কারো হাতে ছিল ইউক্রেনের পতাকা। আবার কেউ কেউ ফিলিস্তিনি কেফিয়াহ স্কার্ফ পরেছিলেন। তাদের হাতে ছিল 'ফ্রি প্যালেস্টাইন' লেখা পোস্টার। ওই সময়ে মার্কিন প্রতিনিধি পরিষদের ডেমোক্র্যাটরা মঞ্চে ট্রাম্পের নীতির সমালোচনা করেন।

ওহাইওর ২০ বছর বয়সী ইন্টার্ন কাইল একাই ট্রাম্পের সমর্থক ছিলেন। তিনি 'মেক আমেরিকা গ্রেট এগেইন' টুপি পরে ওয়াশিংটন ডিসির সমাবেশের এক প্রান্তে হাঁটছিলেন। এ সময় তিনি বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে বিতর্কে জড়াচ্ছিলেন বলে রয়টার্সের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

স্ট্যামফোর্ডের ৭৪ বছর বয়সী অবসরপ্রাপ্ত অ্যাটর্নি পল ক্রেটশম্যান বলেন, তিনি প্রথমবারের মতো কোনো বিক্ষোভে অংশ নিয়েছেন।

'আমার উদ্বেগ হলো সামাজিক সুরক্ষা ধ্বংস হতে যাচ্ছে। আমরা সুবিধাগুলো হারাতে যাচ্ছি,' বলেন তিনি।

ডোনাল্ড ট্রাম্প দ্বিতীয় বার প্রেসিডেন্ট হিসাবে আমেরিকার কুর্সিতে বসেছেন তিন মাসও পূরণ হয়নি। তার মধ্যেই তাঁকে ঘিরে ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়েছে দিকে দিকে। ট্রাম্পের নীতির বিরুদ্ধে সরব হয়ে রাস্তায় নেমেছেন হাজার হাজার আমেরিকান। শনিবার (স্থানীয় সময়) সকাল থেকে ভিড় উপচে পড়েছে নিউ ইয়র্ক, কলোরাডো, হিউস্টন, লস অ্যাঞ্জেলেস এমনকি, খাস ওয়াশিংটনের রাস্তাতেও! ট্রাম্পের বিরুদ্ধে প্ল্যাকার্ড হাতে নিয়ে স্লোগান দিতে দিতে মিছিল করছেন মানুষ। আমেরিকার ৫০টি প্রদেশের অন্তত ১২০০টি এলাকায় শনিবার মিছিল এবং জমায়েত হয়েছে। বার্তা একটাই, ‘‘আমেরিকার কোনও রাজা নেই। আমেরিকায় ফ্যাসিবাদ চলবে না।’’ ট্রাম্প দ্বিতীয় বার ক্ষমতায় আসার পর এটাই আমেরিকায় সবচেয়ে বড় বিরোধী বিক্ষোভ।

ক্ষমতায় আসার পর একাধিক বিতর্কিত সিদ্ধান্ত নিয়েছেন ট্রাম্প। প্রশাসনে পর পর কর্মীছাঁটাই থেকে শুরু করে অভিবাসীদের দেশে ফেরত পাঠানো, মার্কিন নাগরিকত্বের জন্য নতুন নিয়ম চালু কিংবা অতি সম্প্রতি তাঁর শুল্কনীতি— শুধু আমেরিকায় নয়, সারা বিশ্বে ট্রাম্পের বিরুদ্ধে ক্ষোভের সঞ্চার করেছে। যে কারণে শনিবার আমেরিকার বাইরে কোথাও কোথাও বিক্ষোভ দেখা গিয়েছে। ট্রাম্প-বিরোধী মিছিল বেরিয়েছে লন্ডন এবং বার্লিনেও।

ম্যানহাটনে ট্রাম্প-বিরোধী মিছিলে হাঁটতে হাঁটতে এক প্রতিবাদী বলেন, ‘‘আমার ভীষণ ভীষণ রাগ হচ্ছে। বিশেষ সুবিধাপ্রাপ্ত একদল মানুষ নিজেদের ইচ্ছামতো আমাদের দেশটাকে চালাচ্ছেন। আমাদের দেশ আর মহান নেই।’’ ওয়াশিংটনের রাস্তায় স্লোগান দিতে দিতে এক প্রৌঢ় বলেন, ‘‘নিউ হ্যাম্পশায়ার থেকে বাসে করে আমরা প্রায় ১০০ জন এখানে প্রতিবাদ জানাতে এসেছি। এই প্রশাসনের জন্য বিশ্ব জুড়ে বন্ধুদের হারাচ্ছি আমরা। সকলের সঙ্গে সম্পর্ক খারাপ হচ্ছে। দেশের মধ্যেও তারা বিভাজন তৈরি করছে। আমাদের সরকারকে ওরা ধ্বংস করে দিচ্ছে।’’

ক্ষমতায় আসার পর গর্ভপাত বিরোধী নীতি গ্রহণ করেছিলেন ট্রাম্প। তার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানাতে লস অ্যাঞ্জেলেসে এক তরুণীর হাতে প্ল্যাকার্ড দেখা যায়। তাতে লেখা ছিল, ‘‘আমার গর্ভ থেকে বেরিয়ে যাও।’’ বস্টনের এক প্রতিবাদী সংবাদ সংস্থা এএফপিকে বলেন, ‘‘আমরা এখানে ফ্যাসিবাদ বন্ধ করার জন্য জড়ো হয়েছি। বিরোধীদের, অভিবাসীদের নির্বিচারে উনি জেলে ভরে দিচ্ছেন। সেই নেতাকে আমরা থামাতে চাই।’’

সবচেয়ে বড় প্রতিবাদী জমায়েত দেখা গিয়েছে রাজধানী ওয়াশিংটনেই। হোয়াইট হাউস থেকে ঢিল ছোড়া দূরত্বে ন্যাশনাল মলে কয়েক হাজার মানুষ জড়ো হয়েছেন। দেশের নানা প্রান্ত থেকে প্রতিবাদ জানাতে রাজধানীতে এসেছেন অনেকে। তাঁদের ট্রাম্প-বিরোধী স্লোগানে মুখরিত হয়েছে রাস্তাঘাট। কিছু সংগঠনের হিসাব বলছে, শুধু ওয়াশিংটনেই ২০ হাজার মানুষ ট্রাম্পের বিরুদ্ধে জমায়েতে শামিল হয়েছেন। কোনও কোনও রিপোর্টে দাবি, সংখ্যা আরও বেশি হতে পারে।

লন্ডনের রাস্তায় ট্রাম্প-বিরোধী মিছিল থেকে এক মহিলা বলেন, ‘‘আমেরিকায় যা হচ্ছে, সেটা সকলের সমস্যা। আমরা তাই প্রতিবাদ জানাতে রাস্তায় নেমেছি। অর্থনীতি নিয়ে ট্রাম্প পাগলামি করছেন। গোটা পৃথিবীকে উনি মন্দার দিকে ঠেলে দিচ্ছেন।’’ বার্লিনের রাস্তায় ৭০ বছরের এক বৃদ্ধের কথায়, ‘‘সাংবিধানিক সঙ্কট তৈরি করেছেন ট্রাম্প। উনি পাগল হয়ে গিয়েছেন।’’

ট্রাম্প অবশ্য কোনও বিরোধিতায় আপাতত কান দিচ্ছেন না। হোয়াইট হাউসে বসে তিনি সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, ‘‘আমার নীতি কখনও বদলাবে না।’’ সম্প্রতি বিভিন্ন দেশের পণ্যে ‘পারস্পরিক শুল্ক’ আরোপ করেছেন ট্রাম্প। ভারতীয় পণ্যে নেওয়া হবে ২৬ শতাংশ শুল্ক। এর ফলে আমেরিকার অর্থনীতি ভেঙে পড়তে পারে বলে অনেকে মনে করছেন। ট্রাম্পের নীতির নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে গোটা বিশ্বের বাণিজ্যে। ইতিমধ্যে আমেরিকার পণ্যে চিন পাল্টা শুল্ক আরোপের কথা ঘোষণা করেছে।

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়