শিরোনাম

প্রকাশিত : ২৬ ফেব্রুয়ারি, ২০২৫, ০৬:১৪ বিকাল
আপডেট : ২৬ ফেব্রুয়ারি, ২০২৫, ১১:৪১ রাত

প্রতিবেদক : নিউজ ডেস্ক

ইরানি সংযোগের অভিযোগ

বাংলাদেশের এলপিজি সরবরাহকারী অক্টেন এনার্জির ওপর মার্কিন নিষেধাজ্ঞা

যুক্তরাষ্ট্রের অর্থ মন্ত্রণালয়ের ফরেন অ্যাসেটস কন্ট্রোল অফিস (ওএফএসি) এবং পররাষ্ট্র দপ্তর ইরানের পেট্রোলিয়াম-সম্পর্কিত পণ্য পরিবহন ও বাণিজ্যে সহায়তাকারী হিসেবে অভিযুক্ত ৩০টিরও বেশি সংস্থা ও জাহাজের ওপর নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে সংযুক্ত আরব আমিরাতভিত্তিক অক্টেন এনার্জি গ্রুপ এফজেডসিও, যারা বাংলাদেশে তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাস (এলপিজি) সরবরাহ করে। এতে দেশের জ্বালানি আমদানি নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে।

গত বছরের ৩ অক্টোবর, অক্টেন এনার্জির ৪০ হাজার ৩৯ দশমিক ১৩ টন এলপিজি পানামা-ফ্ল্যাগযুক্ত জাহাজ 'জিএজেড জিএমএস'-এর মাধ্যমে চট্টগ্রাম বন্দরে পৌঁছায়। 

বাংলাদেশ এলপিজি অপারেটরস অ্যাসোসিয়েশন (এলওএবি) চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষসহ বিভিন্ন সরকারি সংস্থার কাছে অভিযোগ করে যে, সরবরাহকৃত এই এলপিজি ইরান থেকে এসেছে, যা নিষেধাজ্ঞার আওতায় থাকা দেশ। সংগঠনটি জাহাজটিকে আটক করে আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানায়।

এই অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ (সিপিএ) কাস্টমস, কোস্ট গার্ড ও মেরকেন্টাইল মেরিন বিভাগের কর্মকর্তাদের নিয়ে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করে। 

তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনে বলা হয়, জাহাজ 'জিএজেড জিএমএস' ৪ থেকে ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৪-এর মধ্যে সংযুক্ত আরব আমিরাতের মিনা রাশিদ বন্দরে জাহাজ-থেকে-জাহাজ পদ্ধতিতে এলপিজি লোড করে এবং পরে খোরফাক্কানে জ্বালানি সংগ্রহের পর চট্টগ্রামের উদ্দেশ্যে যাত্রা করে। এতে ইরানি উৎসের কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি।

তবে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের (সিপিএ) তদন্ত প্রতিবেদন সত্ত্বেও, অক্টেন এনার্জির ওপর সাম্প্রতিক মার্কিন নিষেধাজ্ঞা তদন্তের গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। মেরিটাইম গোয়েন্দা সংস্থা লয়েডস লিস্ট ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে দাবি করে, সিপিএ কমিটি 'জিএজেড জিএমএস' এবং 'ক্যাপ্টেন নিকোলাস' নামের আরেকটি জাহাজের কার্গোর উৎস নির্ধারণে ভুল করেছে।

যুক্তরাষ্ট্র ইরানের পেট্রোলিয়াম বাণিজ্যের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিচ্ছে। ফলে বাংলাদেশকে তার এলপিজি আমদানি উৎস নিয়ে নতুন করে ভাবতে হতে পারে, যাতে দেশটি কোনো ধরনের মাধ্যমিক নিষেধাজ্ঞার মুখে না পড়ে।

চট্টগ্রাম বন্দরের ডেপুটি কনজারভেটর ক্যাপ্টেন ফরিদুল আলম বলেন, তদন্ত কমিটির প্রতিবেদন প্রাপ্ত নথিপত্রের ভিত্তিতে প্রস্তুত করা হয়েছে। তিনি জানান, নথি অনুযায়ী এলপিজিটি ওমান থেকে সংগ্রহ করা হলেও বহনকারী জাহাজটি ইরানি মালিকানাধীন ছিল।

তার দাবি, বাংলাদেশ ও ইরানের মধ্যে কূটনৈতিক সম্পর্ক থাকায় আন্তর্জাতিক বাণিজ্য আইন অনুসারে এ ধরনের কার্গো গ্রহণ করা যায়। তিনি অতীতের একটি ঘটনার উদাহরণ দিয়ে বলেন, 'দুই বছর আগে যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞার আওতাভুক্ত একটি জাহাজ ইরানের পণ্য নিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করতে চাইলে প্রথমে বাধা দেওয়া হয়, পরে সরকারের নির্দেশে অনুমোদন দেওয়া হয়।

নতুন নিষেধাজ্ঞার ফলে বাংলাদেশের জ্বালানি খাতের ওপর বড় প্রভাব পড়তে পারে। অক্টেন এনার্জির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বাংলাদেশি প্রতিষ্ঠানগুলোকেও নিষেধাজ্ঞার ঝুঁকিতে পড়তে হতে পারে।

বাংলাদেশ শিপিং বিভাগের প্রধান নটিক্যাল সার্ভেয়ার ক্যাপ্টেন গিয়াস উদ্দিন বলেন, নিষেধাজ্ঞার আওতাভুক্ত কোম্পানির সঙ্গে ব্যবসা করা বাংলাদেশের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে। এমনকি এসব কোম্পানির পণ্য বহনকারী জাহাজগুলোকেও নিষেধাজ্ঞার আওতায় ফেলা হতে পারে।

এলওএবি সভাপতি আমিরুল হক বলেন, আমরা সবসময় নিষেধাজ্ঞার আওতাভুক্ত কোম্পানির সঙ্গে লেনদেন এড়িয়ে চলার পরামর্শ দিয়ে আসছি।

বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান জানান, কোনো বাংলাদেশি প্রতিষ্ঠান নিষেধাজ্ঞার আওতাভুক্ত কোম্পানির সঙ্গে লেনদেন করতে পারবে না। যদি কোনো পণ্য নিষেধাজ্ঞার আগে আমদানি করা হয়ে থাকে, তবু নিষেধাজ্ঞা কার্যকর হলে এর এলসি পরিশোধ করা সম্ভব হবে না।

যুক্তরাষ্ট্র শুধুমাত্র অক্টেন এনার্জির ওপরই নয়, ইরানের পেট্রোলিয়াম বাণিজ্যের সঙ্গে জড়িত আরও কয়েকটি আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধেও নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে ইরানভিত্তিক কঙ্গান পেট্রো রিফাইনিং কোম্পানি, ভারতীয় প্রতিষ্ঠান বিএসএম মেরিন এলএলপি, অস্টিনশিপ ম্যানেজমেন্ট, কসমস লাইনস ইনক, আমিরাতভিত্তিক এলকনস্ট মেরিটাইম ডিএমসিসি, মালয়েশিয়াভিত্তিক আইএমএস লিমিটেড, এবং সিসিলিসভিত্তিক ওশেনএন্ড শিপিং লিমিটেড। 

এই সংস্থাগুলোকে ইরানি পেট্রোলিয়াম ও পেট্রোকেমিক্যাল পণ্যের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট উল্লেখযোগ্য লেনদেনে জড়িত থাকার অভিযোগে মার্কিন নির্বাহী আদেশ ১৩৮৪৬-এর আওতায় নিষিদ্ধ করা হয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রের অর্থ মন্ত্রণালয় ২৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৫ এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এই নিষেধাজ্ঞার ঘোষণা দেয়।

বাংলাদেশের এলপিজি আমদানির এই নতুন সংকট কীভাবে সমাধান হবে, তা এখনো অনিশ্চিত। তবে সরকারের সামনে এখন কঠিন চ্যালেঞ্জ—একদিকে জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, অন্যদিকে কূটনৈতিক ও বাণিজ্যিক ভারসাম্য বজায় রাখা। উৎস: বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড।

 

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়