তুহিন রেজা, নওগাঁ: একসময় গ্রামের মাঠজুড়ে দেখা যেত সবজিখেত। এখন সেই মাঠে চোখে পড়ে মসলাজাতীয় ফসলের খেত। মসলাজাতীয় ফসল চাষে চমক দেখিয়েছে কৃষক জহুরুল ইসলাম।
জহুরুল ইসলামের বাড়ি নওগাঁর রানীনগর উপজেলার শিয়ালায়। মসলাজাতীয় ফসল জিরা। দেশে চাহিদার প্রায় পুরোটায় আমদানিনির্ভর। আর সেই মূল্যেবান জিরা চাষ শুরু করেছেন কৃষক জহুরুল ইসলাম। এই গ্রামে তার এই পরীক্ষামূলক জিরা চাষ দেখে স্থানীয় কৃষকদেরও আগ্রহ বেড়েছে। ফলে অন্যান্ন সবজি চাষের বিকল্প হিসেবে জিরা ব্যাপক আশা জাগাবে বলে স্থানীয় কৃষকদের এমনটাই আশা।
প্রাচীনকাল রান্নার স্বাদ ও ঘ্রাণ বাড়াতে জিরা ব্যবহার করা হয়ে আসছে। জিরা শুধু মশলা নয়। বহু রকমের বিশেষ ঔষধি গুণসম্পন্ন। এটি শুধু খাবারের স্বাদ বাড়ায় না, বরং শরীরের নানাবিধ সমস্যা সমাধানে জিরার অবদান রয়েছে।
সরেজমিনে জানা যায়- কৃষক জহুরুল ইসলাম বিভিন্ন সময় দেশি-বিদেশি সবজি চাষ করে থাকেন। বাজারে জিরার দাম বেশি হওয়ায় তিনি জিরা চাষে উদ্বুদ্ধ হন। এরপর অনলাইনে চাষাবাদ পদ্ধতি দেখতে শুরু করেন। অনেক চেষ্টা করে অনলাইনের মাধ্যমে ভারত থেকে প্রায় ১ হাজার টাকা খরচ করে ৫০০ গ্রাম জিরা বীজ সংগ্রহ করেন। এরপর স্থানীয় কৃষি বিভাগের পরামর্শে ৯ শতক জমিতে এই জিরা বীজ রোপণ করেন। বর্তমানে জহুরুলের জিরা গাছে ফুল ও জিরা আসতে শুরু করেছে। তিনি পরীক্ষামূলক জিরা চাষে অনেকটা সফল হওয়ায় স্থানীয় কৃষদের মধ্যেও জিরা চাষে আগ্রহ বাড়ছে।
কৃষক জহুরুল ইসলাম বলেন, প্রথমে বীজ সংগ্রহের পর পানিতে ৩০টি জিরা বীজ ভিজে টিস্যুর মধ্যে রেখে পরীক্ষা করি, কী পরিমান গাছ গজাবে। পরে ৩০টির মধ্যে ২৫টি গাছ উঠে। তখন ৯ শতক জমি হালচাষ ও সার ছিটিয়ে বীজ রোপন করি। বীজ রোপনের ৮ থেকে ১০ দিনের মধ্যে জিরা গাছ উঠতে শুরু করে। পরে বৃষ্টির কারনে কিছু গাছ নষ্ট হয়ে যায়। বাকি গাছগুলো ভালো করে যত্ন নেয়া শুরু করি।
তিনি আরো বলেন, যেভাবে সরিষার চাষ করা হয় একই রকমভাবে জিরা চাষ করেছি। এর মধ্যে গাছে ফুল ও জিরা ধরতে শুরু করেছে। গাছে যতগুলো ফুল; ততগুলোই জিরা ধরছে। হিসেব করে দেখছি যেভাবে জিরা ধরছে তাতে ৯ শতক জমি থেকে ২০ থেকে ২২ কেজি জিরা পাওয়া যাবে। বাজারে জিরার দাম ভালো থাকায় যার বাজার মূল্যে ২০ থেকে ২৫ হাজার টাকা। তাতে জিরা চাষ একটি লাভজনক ফসল মনে হয়েছে। তবে জিরা চাষ শীতকালে ভালো হয়। বীজ বপণের ৩ থেকে সাড়ে তিন মাস সময় লাগে জিরা ঘরে উঠতে। এ বছর পরীক্ষামূলকভাবে জিরা চাষ সফল দাবি করে আগামীতে আরও বড় পরিসরে জিরা চাষাবাদের পরিকল্পনা করছেন বলে জানান তিনি।
স্থানীয় তানজিব হোসাইন নামে এ যুবক বলেন, জহরুল ভাই নতুন ফসল জিরা চাষ করেছেন। জিরা চাষ ইতিপূর্বে আমরা কখনো দেখিনি। প্রথম হলেও খুব সুন্দর তার জিরার গাছ হয়েছে। বাজারে জিরার দাম ভালো রয়েছে। চিন্তা করছি তার দেখাদেখি আমরাও জিরা চাষ করবো এবং জিরা চাষ করে লাভবান হওয়ার সম্ভাবনা আছে।
স্থানীয় আরেক কৃষক মোফাজ্জল হোসেন বলেন, আমাদের এই এলাকায় জিরা চাষ প্রথম হিসেবে মোটামুটি গাছ ভালোই হয়েছে জহুরুলের। শুনলাম তার এই জমিতে ২ হাজার টাকা খরচ হয়েছে আর পাবে ২০ থেকে ২৫ হাজার টাকা মতো। কৃষি বিভাগ থেকে সহযোগিতা করলে আমরাও জিরা চাষ শুরু করবো।
রানীনগর উপজেলা কৃষি অফিসার ফারজানা হক বলেন, জহুরুল ইসলাম একজন উদ্যোগী কৃষক। তিনি নতুন ফসল হিসেবে জিরা পরীক্ষামূলকভাবে চাষ করেছেন। তার জিরা চাষ কৃষি বিভাগ সার্বক্ষনিক নজরে রেখেছে। আমরা শেষ পর্যন্ত এটার ফলন কেমন হয় সেটা দেখবো। তিনি জিরা চাষে সফল হলে উঠান বৈঠক, সভা, সেমিনার করে অন্য কৃষকদেরও জিরা চাষে উদ্বুদ্ধ করা হবে।
তিনি আরও বলেন, দেশে যে পরিমাণ জিরার চাহিদা তার পুরোটাই আমদানি করতে হয়। জিরা মসলা এখনও বাংলাদেশ আমদানিনির্ভর। তাই এই জিরা চাষে সফল হলে কৃষিতে বাণিজ্যিকীকরণ ও জিরা উৎপাদন করে আমদানির পরিমাণ কমানো সম্ভব বলে মনে করেন এই কৃষি অফিসার।