Skip to main content

ভূতের গল্প

বোয়ালখালী মাইজভান্ডার শরীফে গিয়েছি সেবার। বার্ষিক উরসে। শীতের সময়। পীর সাব মারফতি গান শুনছেন আগত শিল্পীদের কণ্ঠে। জমে গেছে মজমা। আমি গুটি গুটি পায়ে বেরিয়ে এলাম দরবার ছেড়ে। তখন রাত টা। আজ বিকেলে এসেছি আমরা। আমাদের দরবারের কাছেই একটা রুম দেয়া হয়েছে। ব্যাগ ব্যাগেজ সেখানেই রেখে বিছানাও করে নিয়েছি সবাই। আশপাশটা দেখা হয়নি। সময় পাইনি। এখন একটু ঘুরে দেখা যায়। দরবার শরীফের পাশেই মসজিদ, মসজিদের ভেতরে মাজার। সামনে সানবাঁধানো পুকুর। পুকুরের পাশ ঘেঁষে পাকা রাস্তা চলে গেছে বাজারের দিকে, জঙ্গলের ভেতর দিয়ে। পথ ধরে এক কিলোমিটারের মতো গেলে তিন রাস্তার মোড়। রাস্তার পাশে ফসলের বিস্তীর্ণ মাঠ। মাঠে বসেছে মেলা। বেশ জমজমাট মেলা।

ঘুরতে ঘুরতে আর দেখতে দেখতে কখন যে মাঝরাত পেরিয়ে গেছে বুঝতে পারিনি। মোবাইলের ঘড়িতে দুইটা বাজতে দেখে হুঁশ হলো। ফেরা তো দরকার! যাদের সাথে এসেছি, তারা এতোক্ষণে নিশ্চয়ই রুমে ফিরে এসেছে! ফেরার পথ ধরলাম।

সাথে কেউ নেই, জঙ্গলের রাস্তা, যদিও আকাশে বড় করে চাঁদ উঠেছে, কিন্তু এই নির্জন বন্য রাস্তায় চিরল চিরল পাতার ফাঁকে চুইয়ে আসা ম্লান জ্যোৎস্না মনটা কেমন ভারি করে দেয়। পথেঘাটে একা চলতে আমি ভয় পাই না। ভূত-টুতেও বিশ্বাস নেই। কিন্তু এই নিশুথি রাতে জঙ্গলের মাঝ দিয়ে চলে যাওয়া একলা পথে হাঁটতে গা কেমন ছম ছম করে! মাজারে জ্বিনের আনাগোনার প্রচলিত গল্পগুলো মনে এলে তো আরো! ফিরে যাচ্ছি একাই, গভীর রাতে গ্রামদেশের জঙ্গলি পথে একা হেঁটে যেতে যেমনটা লাগার কথা, অতোটা ভয় লাগছে না, কিন্তু কেমন একরকম লাগছিলো, শরীরটাও ভারি ভারি লাগছে। এভাবেই প্রায় সিকি কিলোমিটার আসার পরে মনে হচ্ছিলো এভাবে একা একা না ফিরলেই হতো! আর কিছুক্ষণ পরে তো মেলার লোকজন ঘরে ফিরতে শুরু করবে। সঙ্গী-সাথী পাওয়া যেতোই! গল্প করতে করতে যাওয়া যেতো!

মনের অজান্তেই চলার গতি শ্লথ হয়ে গেলো। সামনের দিকেই যাবো, না ফিরে যাবো মেলার দিকেই! মনের মধ্যে টানাপড়েন শুরু হয়ে গেছে। এমন সময় লক্ষ্য পড়লো লোকটার প্রতি। মাঝবয়সী, সুন্নতি পোশাক পরা। আসছিলেন আমার পেছনেই। একটু দূরত্ব রেখে। কি বেখেয়ালী মানুষ আমি! একটুও লক্ষ্য করিনি! হুজুর টাইপের মানুষটা আমার পাশে পাশে হাঁটছেন এখন। আলাপী মানুষ। হাঁটতে হাঁটতেই জানা হয়ে গেলো এই মাজারের ইতিহাস। বর্তমান পীর সাহেবের বাবার অলৌকিক কাজ কর্মের গল্প। কথায় কথায় পীর সাহেবের জ্বিন মুরিদদের কথাও উঠলো। খবিশ জ্বিন আর ভূত-প্রেতের প্রসঙ্গও তুললাম আমি। এখন আর অতোটা অস্বস্তি লাগছে না। ওরসের কাছাকাছি এসে গেছি। মাজারের জেনারেটর চালিত বিদ্যুতের বাতিগুলো দেখা যাচ্ছে, কাছেই।

আমার সাথের লোকটি হুজুর হলেও জ্বিনটিনের ব্যাপারে অতোটা উৎসাহী মনে হচ্ছে না! ভূতের প্রসঙ্গ উঠতে তো শব্দ করেই হেসে ফেললেন! মাজারে আসার পথে লোকজনের কাছে শোনা অশরীরী মুরিদ এবং মন্দ ভূতদের কথা জানালাম তাকে। শুনে প্রথমে গম্ভীর হয়ে গেলেন তিনি। চুপচাপ হাঁটছেন আমার পাশাপাশি। বেশ কিছুক্ষণ পরে কথা বললেন, ‘আসলে ভাই, এই ভূতটুতের কথা একেবারেই গালগল্প। ওসবে বিশ্বাস করে বোকা লোকেরা।হাসিখুশি তরল গলায় বললেন তিনি।

আপনি এতো নিশ্চিতভাবে বলছেন কী করে!’ খানিকটা প্রতিবাদের ঝোঁকে বললাম আমি।

এখানে সবাই তো বিশ্বাস করে। অনেকে তো দেখেছেনও!’ খল খল করে হেসে উঠলেন আমার সহযাত্রী। চমকে গেলাম।

আরে ভাই, রাখেন। মরার পরে গত আট বছর ধরে এখানে আছি, আমি তো এতো দিনেও কোনো ভূতটুতের দেখা পেলাম না এখানে!’প্রথমে হতভম্ব হয়ে গেলাম আমি। ঠিক শুনলাম তো! ঘাড় ঘুরিয়ে তাকালাম সঙ্গীর দিকে। কী অবাক! কোথাও কেউ তো নেই! মাথার মধ্যে কেমন ঝিনঝিন করে উঠলো আমার। আর কিছু মনে নেই। -ফেসবুক থেকে

অন্যান্য সংবাদ