Skip to main content

বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ চুরির ঘটনায় ফিলিপাইনের মায়ার ৫৬ বছরের কারাদণ্ড

বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ চুরির ঘটনায় ফিলিপাইনের নাগরিক মায়ার ৫৬ বছরের কারাদণ্ডের রায় হয়েছে। মায়া সান্তোস দেগুইতো ফিলিপাইনের রিজাল কমার্শিয়াল ব্যাংকিং করপোরেশনের (আরসিবিসি) সাবেক শাখা ব্যবস্থাপক। সেদেশের আদালত এই ঘটনায় তার বিরুদ্ধে মানি লন্ডারিংয়ের আটটি অপরাধের অভিযোগে প্রতিটিতে চার থেকে সাত বছরের কারাদণ্ড দিয়েছে। বৃহস্পতিবার আদালত এই দণ্ডাদেশ দেন। কারাদণ্ডের পাশাপাশি মায়াকে ১০ কোটি ৩০ লাখ (১০৩ মিলিয়ন) ডলারের অর্থদণ্ড দেওয়া হয়েছে। এই চুরিকে বিশ্বের সবচেয়ে বড় সাইবার চুরির ঘটনা বলে মনে করা হয়। এ চুরিতে প্রথম সাজা পেলেন মায়া। 

২০১৬ সালের ৪ ফেব্রুয়ারি কেন্দ্রীয় ব্যাংকের রিজার্ভের হিসাব থেকে ১০ কোটি ১০ লাখ ডলার চুরি হয়। বাংলাদেশ ব্যাংকের অ্যাকাউন্ট থেকে চুরি হওয়া এই অর্থের ৮ কোটি ১০ লাখ ডলার হাতিয়ে নিয়ে তা ফিলিপাইনের রাজধানী ম্যানিলায় আরসিবিসির একটি শাখায় পাঠানো হয়। এরপর খুব দ্রুত এই অর্থের বড় অংশ দেশটির ক্যাসিনোতে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। আরসিবিসির যে শাখায় অর্থগুলো পাঠানো হয়েছিল, সে সময় তার ব্যবস্থাপক ছিলেন মায়া দেগুইতো। এ ছাড়া ওই শাখার সাবেক এক কোষাধ্যক্ষ ও সাবেক পাঁচ কর্মীর বিরুদ্ধেও অর্থ পাচারের অভিযোগ আনা হয়েছে। 

বাকি অর্থ যায় শ্রীলঙ্কায়। শ্রীলঙ্কায় যাওয়া ২ কোটি ডলার ফেরত আসে। আর ফিলিপাইনে যাওয়া ৮ কোটি ১০ লাখ ডলারের মধ্যে এখনো ৬ কোটি ৬৪ লাখ ডলার উদ্ধার করা যায়নি। বাংলাদেশি টাকায় যার পরিমাণ ৫৫৭ কোটি টাকা। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের রিজার্ভ চুরির ঘটনার তিন বছর পূর্ণ হবে আগামী ৩ ফেব্রুয়ারি।

আদালত ২৬ পৃষ্ঠার রায়ে বলেন, ‘অর্থ লেনদেনে মায়ার কিছুই করার ছিল না বলে মায়া আদালতে যে কথা বলেছেন, তা একেবারে নির্জলা ও বড় ধরনের মিথ্যা। মায়া সান্তোস দেগুইতো যুক্তরাষ্ট্রের ব্যাংক থেকে অর্থ আনা এবং তা চারটি অজ্ঞাত ব্যক্তির অ্যাকাউন্টে জমা করার বিষয় নিজে তদারকি করেছিলেন বলে আদালত রায়ে উল্লেখ করেছেন।

ফিলিপাইনের মাকাতি শহরের আরসিবিসি শাখার মাধ্যমে ওই অর্থ ফিলিপাইনে আসার পর তা মুদ্রা লেনদেনকারী ফিলরেম নামের এক প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে চলে যায় তিনটি ক্যাসিনোর কাছে। এভাবে হাতবদল হয়ে সবশেষে ফিলরেমের মাধ্যমে ওই আট কোটি ডলার ফিলিপাইন থেকে আবার অন্য দেশে পাচার হয়ে যায়। এতে ওই ব্যাংকের তৎকালীন শাখা ব্যবস্থাপক মায়া সান্তোস দেগুইতো সম্পৃক্ত থাকার প্রমাণ পায় ডিওজে। এ জন্য আরসিবিসি থেকে বরখাস্ত হন তিনি। গত বছরের আগস্টে ফিলিপাইন সরকার তাঁকে এ কারণে গ্রেপ্তারও করে। মায়া সান্তোস দেগুইতো সব সময় অর্থ পাচারের ঘটনার সঙ্গে নিজের সম্পৃক্ততার বিষয়টি অস্বীকার করে এসেছেন। তাঁর দাবি, আরসিবিসির ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশে তাঁকে কিছু কাজ করতে হয়েছে।

মায়ার আইনজীবী ডেমি কাস্টোডিয়ো এই রায়ের পর জানিয়েছেন, তাঁরা রায়ে হতাশ। এ বিষয়ে মায়া উচ্চ আদালতে যাবেন। আদালত রায়ে বলেছেন, সাবেক এই ব্যাংক কর্মকর্তার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ চূড়ান্ত না হওয়া পর্যন্ত তিনি জামিনে থাকতে পারবেন।
এই মামলায় দেগুইতোই একমাত্র অভিযুক্ত উল্লেখ করে তাঁর আইনজীবী দিমিত্রিও কাস্টোডিও বলেন, তাঁর মক্কেলকে আসলে বলির পাঁঠা বানানো হয়েছে। তিনি একা এই কাজ করতে পারতেন না। আরসিবিসি ব্যাংকের মতো একটি প্রতিষ্ঠান একজন কর্মকর্তাকে এমন পরিকল্পনা আঁটার সুযোগ দেবে না। কাজেই এর সঙ্গে আরও ব্যক্তি জড়িত। আইনজীবী দাবি করেন, তাঁর মক্কেল জরিমানার অর্থ দিতে বাধ্য নন। কেননা, চুরির অর্থ তাঁর নিজের হিসাবে জমা হয়নি। 

এক বিবৃতিতে আরসিবিসি বলেছে, রিজার্ভ চুরির ঘটনায় প্রতিষ্ঠানটি ‘ভুক্তভোগী’ মাত্র এবং দেগুইতো একজন ‘বিপথগামী’ কর্মী ছিলেন। 
ফিলিপাইনে নিযুক্ত বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত আসাদ আলম সিয়াম সাংবাদিকদের বলেছেন, অর্থ চুরির এ ঘটনায় আরসিবিসির অন্য কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে চলমান মামলাগুলোও দ্রুত নিষ্পত্তি হবে বলে তিনি আশা করছেন।

ফিলিপাইনের বিচার বিভাগ বলেছেন, দেগুইতোকে দ-িত করার মধ্য দিয়েই এই মামলা শেষ হয়ে যাবে না। তবে রিজার্ভ চুরির ঘটনায় চলমান অন্য মামলাগুলোর ব্যাপারে তাৎক্ষণিকভাবে তথ্য দিতে পারেনি সংস্থাটি।

বিশ্বের অন্যতম বড় সাইবার অপরাধের এ ঘটনার পর ফিলিপাইনের অন্ধকার একটি দিক সবার সামনে চলে আসে। দেশটি অনেক দিন ধরেই কালোটাকার স্বর্গ হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। ফিলিপাইনে ব্যাংক অ্যাকাউন্টধারীর গোপনীয়তা রক্ষায় কঠোর আইন রয়েছে। এই আইনেরই সুযোগ নিয়েছে হ্যাকাররা। এ ছাড়া ফিলিপাইনের ক্যাসিনো শিল্প তখন দেশটির অর্থ পাচার রোধের আইনের আওতার বাইরে ছিল।

রিজার্ভ চুরির ঘটনায় উত্তর কোরিয়ার একজন হ্যাকারকে খুঁজছে যুক্তরাষ্ট্র। তিনি ও রাষ্ট্রীয় মদদপুষ্ট একটি হ্যাকার গোষ্ঠী বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ চুরি করেছে বলে দেশটির অভিযোগ।

বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভের টাকা চুরির ঘটনায় মতিঝিল থানায় হওয়া মামলাটি তদন্ত করছে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)। মামলার তদন্ত তদারক কর্মকর্তা সিআইডির অর্গানাইজড ক্রাইমের বিশেষ পুলিশ সুপার মোল্যা নজরুল ইসলাম বলেন, রিজার্ভের অর্থ চুরির ঘটনায় বিভিন্ন দেশের নাগরিকদের জড়িত থাকার তথ্য পাওয়া গেছে। দূতাবাস ও সুপ্রিম কোর্টের অ্যাটর্নি জেনারেলের মাধ্যমে সাতটি দেশের নাগরিকদের ব্যাপারে তথ্য চেয়ে চিঠি পাঠানো হয়েছে। ওই সব চিঠির কোনো জবাব পাওয়া যায়নি। এ কারণে মামলা ঝুলে আছে। সিআইডি অভিযোগপত্রও জমা দিতে পারছে না।

অন্যদিকে বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভের অর্থ চুরির ঘটনায় এখনও পর্যন্ত এ দেশের কারও বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। এ ঘটনায় সরকার উচ্চপর্যায়ের তদন্ত কমিটি করলেও আজও প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়নি। পুলিশ এ নিয়ে দফায় দফায় তদন্ত করেই যাচ্ছে। কিন্তু তারাও আদালতে কোন প্রতিবেদন দিচ্ছে না। দফায় দফায় সময় নিচ্ছে। অথচ ফিলিপাইন কর্তৃপক্ষ একের পর এক পদক্ষেপ নিয়েই যাচ্ছে। চাকরিচ্যুত করা, সিনেটে প্রকাশ্য শুনানি, মামলা এবং সর্বশেষ বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ চুরির ঘটনায় গত বৃহস্পতিবার ফিলিপাইনের রিজাল কমার্শিয়াল ব্যাংকিং করপোরেশনের (আরসিবিসি) সাবেক শাখা ব্যবস্থাপক মায়া সান্তোস দেগুইতোকে দোষী সাব্যস্ত করে কারাদ-ের পাশাপাশি জরিমানাও করা হয়েছে।

আর এ ঘটনায় মামলা দায়েরের জন্য আইনি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে চূড়ান্ত আলোচনা করতে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের সচিব আসাদুল ইসলামের নেতৃত্বে একটি দল যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থান করছে। ওই দলে রয়েছেন বাংলাদেশ ফিন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের (বিএফআইইউ) প্রধান আবু হেনা মো. রাজী হাসানসহ ইউনিটের তিন কর্মকর্তা। বাংলাদেশ ব্যাংকের পক্ষে আইনজীবী আজমালুল হোসেন কিউসি এসব আলোচনায় ভিডিও মাধ্যমে যোগ দিচ্ছেন।

এ ঘটনার তিন বছর পূর্তির আগেই মামলা করতে চায় বাংলাদেশ। কারণ, যুক্তরাষ্ট্রের আইনে কোনো ঘটনার তিন বছরের মধ্যে মামলা করতে হবে। এর পাশাপাশি প্রতিনিধিদলটি ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংক অব নিউইয়র্ক ও সোসাইটি ফর ইন্টার ব্যাংক ফিন্যান্সিয়াল টেলিকমিউনিকেশনের (সুইফট) সঙ্গেও আলোচনা করবে।

২০১৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে অর্থ চুরির ঘটনা ঘটলেও তা প্রকাশ পায় পরের মাসে। এ ঘটনায় পদত্যাগ করতে হয় তৎকালীন গভর্নর আতিউর রহমানকে। দুই ডেপুটি গভর্নরকেও সরিয়ে দেয় সরকার। ঘটনা তদন্তে সাবেক গভর্নর মোহাম্মদ ফরাসউদ্দিনকে প্রধান করে কমিটি করে সরকার। বারবার আশ্বাস দিলেও সেই প্রতিবেদন প্রকাশ করেননি তৎকালীন অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত।

এদিকে এ ঘটনায় বাংলাদেশ ব্যাংকের পক্ষ থেকে মতিঝিল থানায় করা মামলার তদন্ত করছে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)। দায়িত্ব পাওয়ার পর সিআইডি বারবার তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের জন্য আদালতের কাছ থেকে সময় চেয়ে নিয়েছে। সর্বশেষ ঢাকার একটি আদালত আগামী ১০ ফেব্রুয়ারির মধ্যে প্রতিবেদন জমা দেওয়ার জন্য গত বুধবার পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগকে (সিআইডি) নির্দেশ দেন।

এবিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র সিরাজুল ইসলাম বলেন, মামলার বিষয়ে খোঁজ নিতে একটি দল যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থান করছে। তাঁরা ফিরে এলেই সিদ্ধান্ত হবে। আর বিচারের বিষয়ে তিনি বলেন, ‘আইনশৃঙ্খলা বাহিনী তদন্ত করছে, সরকারও তদন্ত করেছে। এটা বাংলাদেশ ব্যাংকের বিষয় না।’