Skip to main content

বইয়ের কদর কমেনি

১৯৪৪ সালের জুলাই-অগাস্ট মাসে হঠাৎ করেই ওয়ারশ শহর জার্মানদের বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়ে ওঠে। তারা বুঝতে পারে রেড আর্মি এগিয়ে আসছে এবং জার্মানরা পিছু হটতে শুরু করেছে। তখনো ওয়ারশতে ইহুদি পেলেই নিশ্চিত হত্যা করছে জার্মান বাহিনী, পোলিশদেরও ছাড়ছে না। গোটা শহরে বিদ্যুৎ নেই, খাবারের অভাব, পোস্টাল সার্ভিস নেই। আত্মীয়-স্বজন কে কোথায় কেউ জানে না। এমন অবস্থায় চিকিৎসকরা সাহস করে নেমে আসেন অসংখ্য আহত লোকদের চিকিৎসা দিতে। ওষুধ-ব্যান্ডেজ নেই। কাপ ছিড়ে ক্ষত বাধা হয়। শিক্ষকরা নেমে আসেন ছাত্রদের খোঁজে। তারা ১০-১২ বছরের কিশোরদের একটি বয়েস স্কাউটস সংগঠন নামিয়ে দেন। লোকজনের আত্মীয় স্বজনের কাছে চিঠি আদান-প্রদানের জন্য।

এই কিশোররা মৃত্যুর ঝুঁকি নিয়ে এক এলাকা থেকে আরেক এলাকায় চিঠি, খাবার এবং নানা পার্সেল পৌঁছে দেয়। তারা দরোজায় গিয়ে পার্সেলটি হাতে দিয়ে গ্রহণকারীকে বলে, ‘আমাদের কোনো পোস্টাল স্ট্যাম্প নেই। আপনি যদি একটি বই দেন, তাহলে আমরা বিশেষভাবে কৃতার্থ হই। প্রায় পাঁচ বছর ধরে পোলিশ জাতি কিছু পড়তে পারছে না ওয়ারশর বাসিন্দারা এই ছেলেদের হাতে তাদের প্রিয় বই তুলে দিতে থাকেন।

মৃত্যু, হত্যা, অস্ত্র, রক্তের ¯্রােতের মধ্যেও জাতির বইয়ের প্রয়োজনীয়তা এভাবেই উপলব্ধি করেছিলেন তারা। আজও দেখা যায় প্রযুক্তির এই যুগে বইয়ের কদর একই রকম তীব্র।  গ্রীস, স্পেনের অর্থনৈতিক অবস্থা এখন বেহাল। জীবনযাত্রার মান নেমে গেছে। তারপরও বইয়ের কদর কমেনি।এখনো ইউরোপের ট্রেনে, পার্কে, বিবলিও থেকে মানুষকে বই পড়তে দেখা যায়। তার মধ্যে একটি বড় অংশ তরুণ সমাজে। তাই ইউরোপ এখনো আলোয় আলোকিত।

আমাদের অঞ্চলে পাঠ্যাভ্যাস বরাবরই কম। রবীন্দ্র যুগেও  এক শতাংশের বেশি মানুষের পাঠ অভ্যাস ছিলো বলে মনে হয় না। এখন মোবাইল-ইন্টারনেটের যুগে তা আরো কমে গেছে। সব মানুষ দেখা যায় মোবাইল টিপছে। ঢাকা শহরে হাজার হাজার গাড়িতে প্রতিদিন ঘণ্টার পর ঘণ্টাবড়লোকদের বসে থাকতে দেখি। বছরের পর বছর আজবধি আমি একজন মানুষকে গাড়ির মধ্যে বই পড়তে দেখিনি। গাড়ির ভেতরে দু-একটা বই দেখা যায়। সেগুলো বই না, কিতাব।মুকসেদুল মুমেনীন, নুরানী শরিফ এইসব। জেলা শহরগুলোর অবস্থা অরো শোচনীয়।

এমনি মরুভূমির সমাজে ফুল ফোটাতে চেষ্টা করছে ফরিদপুরে মাহফুজুল আলম মিলন (খন্দকার মিলন) ভাইয়ের নেতৃত্বে গুটিকয়েক মানুষ বইঘাটা নামের একটি নতুন গড়ে ওঠা সংগঠনের মধ্য দিয়ে। প্রতি শুক্রবার মধ্যবয়স্ক তরুণ প্রজন্ম নিয়ে বইঘাটা/বইঘাঁটা মেলা বসছে। জাতির মরুভূমির বুকে ক্যাকটাসকে বাওবাব করে তোলার এই স্বপ্নের প্রতি আমার শ্রদ্ধা-সহযোগিতা-আবেগ আকণ্ঠ। এমন প্রচেষ্টা প্রতি জেলায় কেউ কেউ শুরু করলে শেষ আলোটুকু নিভে যাওয়ার হাত থেকে রেহাই পাবে। আমাদের মনে রাখা দরকার, দরজির কাজ করে দুটো পয়সা বানানো যেতে পারে, ইউরোপকে ছোঁয়া যাবে না। সেজন্য প্রয়োজন জাতীর বইয়ের তৃষ্ণা।