Skip to main content

গালিগালাজের সেকাল-একাল

সাল ১৯৯১। অকুস্থল : নতুনধারার দৈনিকআজকের কাগজে ঝিগাতলাস্থ কার্যালয়। আমি কাজের টেবিলে বসা। সম্পাদকের পিয়ন এসে জানিয়ে গেলো- ‘আপনার বাবা ফোন করেছেন।অফিসে তখন ফোনের আকাল। সম্পাদকের ফোন আমরা চার-পাঁচজন সহকারী সম্পাদকও ব্যবহার করি। উঠে গিয়ে ফোন ধরতে না ধরতেই অপরপ্রান্ত থেকে লাগাতার গালিবর্ষণ-‘কাল সারারাত বাড়ি ফিরিসনি যে! অফিসেই রাত কাটিয়েছিস? একবার ফোন করে জানানোর সময়ও পাসনি? বাসায় আয়, তোর একদিন কী আমার একদিন। আসার সময় একজোড়া নতুন জুতা কিনে আনিস। তোর পিঠেই জুতাজোড়ার শ্রাদ্ধ করবো।আমি বুঝলাম, গোলমালটা কোথায়। সেটা অপরপ্রান্তের বাবাকেও বোঝাতে সক্ষম হলাম- ‘চাচা, আপনি বোধহয় শাহরিয়ার রেজাকে চাইছেন। আমি আবু হাসান শাহরিয়ার। রেজাকে ডেকে দিচ্ছি।

এর পরের গল্প আরো মজার। শাহরিয়ার রেজা ফোন ধরলো এবং প্রায় সঙ্গে সঙ্গে রেখে দিয়ে হন্তদন্ত হয়ে ছুটে এলো আমার কাছে, বললো- ‘আব্বা আমাকে কী কী গালি দিয়েছেন, তা আপনার কাছ থেকে শুনে নিয়ে এক্ষুণি বাসায় যেতে বলেছেন। তো গালিগুলো কী কী, তাড়াতাড়ি বলুন।আমি বললাম, ‘এখন বাসায় যাও, পরে গালিগুলো শোনো।শাহরিয়ার রেজার বাবা ছিলেন রসবোধসম্পন্ন একজন ডাকসাইটে উচ্চপদস্থ সরকারি আধিকারিক এবং আমরা যারা আজকের কাগজে কাজ করতাম, তাদের সবাইকে পুত্রতুল্য স্নেহ করতেন। তো, শাহরিয়ার রেজার হয়ে শোনা সেই মধুর গালিকে আজও আমি আশীর্বাদ বলে জানি।

 

. অনেক বছর পর, ফেসবুক সুবাদেও, বিস্তর গালি খেতে হয়। সেগুলো এতোই স্থূল যে, পাঁচ-সাতদিন গেলে আর মনেও থাকে না। অধিকাংশ গালিবাজকে চোখেও দেখিনি বলে গায়েও মাখি না। দু-চারদিন আগে ইনবক্সে এমন একজনের অকথ্য গালি খেয়েছি, যার সঙ্গে আমার কলকাতা বইমেলায় দেখা হয়েছিলো তরুণ কবি পিউলি মিত্রের প্রথম বইয়ের প্রকাশনা অনুষ্ঠানে। খুবই প্রাঞ্জল ছিলো অনুষ্ঠানটি। পিউলির বাবা-মা-ভাইবোন ছাড়াও ওর বেশ কয়েকজন বন্ধু এসেছিলো অনুষ্ঠানে। পিউলি আমাকেদাদাডাকে। ওর বন্ধুরাও তা-ই। ইনবক্সে গালিগালাজকারী তাদেরই একজন। আমার ফেসবুক বন্ধুরা জানেন, আমি ইনবক্সবিমুখ মানুষ। অতো সময়ও আমার নেই। পিউলির বন্ধু কুমকুমেরও তা অজানা নয়। ইনবক্সে ওর নোটিেিফকশন দেখে ভাবলাম, জরুরি কিছু। না, তুই তুকারি করে গালিগালাজ। ধারণা করলাম, ভুলে আমার ইনবক্সে চলে এসেছে। না, তা- নয়। পুনঃপুন আসতে লাগলো গালির তুবড়ি। তাতে ধারণা হলো, হ্যাক হয়েছে কুমকুমের আইডি। গালি হ্যাকার দিচ্ছে। ত্রিপুরার কবি তকমাধারী বজ্জাত হ্যাকার অপাংশু দেবনাথের কথাও মনে পড়েছিলো এক ঝলক। আমি চল্লিশ বছর ধরে সাংবাদিকতা পেশায় জড়িত। আসল খবরটা বের করতে খুব বেগ পেতে হলো না। গালিগুলো কুমকুমই দিয়েছে। ওর চেয়ে ওর বন্ধুদের কারো কারো স্ট্যাটাসে কবিতায় তুলনামূলকভাবে বেশি সাড়া দিয়েছি বলে। অর্থাৎ ঈর্ষাসঞ্জাত গালিগালাজ। বন্ধুদের প্রতি ঈর্ষা।

আমাদের তারুণ্যেও কাব্যঈর্ষা ছিলো। কিন্তু, তখন ঈর্ষারও মাত্রাজ্ঞান ছিলো। এখন যুগটাই পোশাকি। দাদা-বোন সম্পর্ক আদায়-কাঁচকলা সম্পর্কে গড়াতে সময় নেয় না। তাই, কুমকুমকে দোষ দিই না। শত হলেও একদিন বইমেলার মাঠেদাদাতো ডেকেছিলো। মাঠে ইশানি মৌলিকের মতো একজন মনের পেটের বোনকে তো পেয়েছিলাম? কুমকুম যে দুর্গাপুরে থাকে, সেখানে সুমিতা মল্লিকের মতো সজ্জনও থাকেন, যিনি আমার নামে ভারতের মাটিতে একটি বকুলগাছ লাগিয়েছেন। মিরা সিনহা নামের কবিতাপ্রেমীর সঙ্গেও বইমেলার মাঠে প্রথম সাক্ষাৎ, যার কবিতাবোধ আমাকে মুগ্ধ করেছিলো। সর্বোপরি কুমকুম নামে দেশে আমার এক শৈশবের বন্ধু আছে, যে একাই হাজার বোনের সমান- ছড়াকবি মাহবুবা হক কুমকুম। তাই, এসব তুচ্ছ বিষয় উড়িয়ে দিয়ে হাসতে হাসতেই বলতে পারি: ‘আরো কিছু অপমান বাকি আছে, তাদেরও ডেকেছি/আরো কিছু হিংসা আমি মৌনব্রতে মাথা পেতে নেবো।

লেখক : কবি। ফেসবুক থেকে

অন্যান্য সংবাদ