Skip to main content

অস্তিত্বের আয়না কেন অনস্তিত্ব?

জগতে 'আছে' আর 'নাই' দেখি আমরা। আবার 'নাই' অবস্থার মাঝে আছেও দেখি। নাথিং যে নাথিং না তাও দেখি। যাদুবিদ্যার মাধ্যমেও আছে আর নাই দেখি। যাদুগর সুকৌশলে নিজেকে বাক্সের ভিতর নাই করে ফেলে আমাদের চমক লাগান, আমরা সত্যিই নাই হওয়া দেখি। আবার তিনি যে নাই হন নাই, আছেন, সেটাও দেখি। এইরকম দেখাকে ম্যাজিক বলি, ভেলকি বলি, ইল্যুশনিজম বলি।

সাধারণভাবে আমাদের চোখে দেখার মাঝে বিভ্রম যে আছে তাও দেখি। আকাশকে একটা বিশাল শামিয়ানা মনে হয়। আসলে ত অমন কোনো শামিয়ানা নাই। আকাশের দিকে যাইতে যাইতে যাইতে বহু দূরেরও অনেক দূর থেকে পেছনে ফিরে দেখলে দেখা যায় পৃথিবীটা আসমানে চাঁদের মত।

মহাশূন্যে শূন্যস্থান নাই বিজ্ঞান বা বিশেষ জ্ঞানের নজরে আমরা দেখতে পাই। আমরা নানা ক্ষেত্রে শূন্যস্থান দেখাই, এর সাপেক্ষতা আছে। কোনো বাক্যের শূন্যস্থান মানে ঐ জায়গায় এক বা একাধিক প্রাসঙ্গিক শব্দ বিশেষ কারণে মুছে ফেলা হয়েছে। "একটি খালি চেয়ার আছে" মানে ঐ চেয়ারে কেউ বসে নাই বলেই ওটা খালি। এই খালিত্ব বা শূন্যতা কেউ না-বসার সাপেক্ষে। জায়গাটা ত আসলে খালি না, চেয়ার আছে, চেয়ারের শূন্যস্থানে চেয়ারের শরীর আছে।

তাইলে আমাদের নাথিং নির্ধারণের জ্ঞান কোন বস্তু বা বিষয় সাপেক্ষে। টেবিলের উপর কিছুই রাখা ছিল না। আমরা তখন বললাম— "কিছুই নাই, নাথিং।" যখন কিছু রাখলাম, নাই-য়ের মাঝে 'শাই' এল। 'শাই' আরবি শব্দ, মানে কিছুএকটা। এখানে আছে আর নাই এর দ্বৈততার জ্ঞান দেখতে পাই। জগত বাস্তবতায় ডুয়েলিজম আছে দেখি। ননডুয়েলিটি-ও দেখি। ডিফল্ট বা এবসেন্স বা অনুপস্থিত অবস্থায় থাকাও দেখি। মানে, আছে কিন্তু নাই অবস্থায় আছে দেখি। এই দেখা চোখে দেখা না, জ্ঞানের আলোতে দেখা, যে-দেখা মানে উপলব্ধিতে আসা।

এই যে আমাদের আছে আর নাই জ্ঞান, এটা আবার আমাদের দর্শনেন্দ্রীয় দ্বারা বুঝ পাওয়া সাপেক্ষে। মানে, চোখ দেখছে আছে, চোখ দেখছে নাই। ভুলও দেখে এই চোখ (প্রাগুক্ত)

জালালুদ্দিন রুমি অন্তরের চোখে দেখলেন অস্তিত্বের আয়না অনস্তিত্ব। সাফ বললেন — What is the mirror of being? Non-being. Always bring a mirror of non-existence
as a gift. Any other present is foolish.

মানে কি? অনস্তিত্বে উদ্ভাসিত অস্তিত্ব? অনস্তিত্বে প্রতিবিম্বিত আমি? নাকি শূন্যতে আমি এক সপ্রাণ বস্তু প্রকাশিত সেই কথা? শূন্যস্থান পূরণ হয়েই মেনিফেস্টেশন হচ্ছে? মানে বিকাম (become) হচ্ছে নাথিং-এর অবস্থান থেকে? এই হওয়া আর না-হওয়ার মাঝে পূর্ণতা আর অপূর্ণতার পরিপ্রেক্ষিত দেখি আমরা।

তার আগে ভাবা যাক আয়না জিনিসটা কি? 

যে জিনিসের সেল্ফ মেনিফেস্টেশন নাই, মানে নিজেকে দেখায় না, অন্যকে দেখায়। আয়না তেমন এক চিজ্। আয়নার সামনে যাকিছু আসে তা প্রতিবিম্বিত হয়। আয়নার আমিত্ব নাই, আত্মঅহং নাই। রুমি জানান, আপনার ক্ষতিকর আদত, আপনার ত্রুটি, অপূর্ণতা আপনার মনের আয়নায় দেখবার পর, পরম পূর্ণতার দিকে আপনার যাওয়া হল শুরু। তিনি বলেন, "An empty mirror and your worst destructive habits, when they are held up to each other,
that's when the real making begins.
That's what art and crafting are."

আমি অবাক হয়ে দেখলাম, ক্যানারি পাখিটি তার প্রিয়তমাকে কাছে পাচ্ছে না বলে, সে নানা সুরে ডাকে, তার মাঝে দিওয়ানাপন আসে, বেকারার হয়, অস্থির হয়, তার ডাকে শিল্প প্রকাশ পায় — শিল্পনৈপূণ্য প্রকাশ পায়। যখন সে তাকে পেল, আর তার ডাক নাই, মর্মস্পর্শী গান নাই, অপূর্ণতার হায় হায় নাই, শিল্প রচনা নাই।

আমি অপূর্ণ। আমি ইবলিসের মতো বলব কেন "আমিই উত্তম"? আমার বুঝ ষোলআনা নাইই। আমি আমাকে আয়নাতে দেখে, আমার জাহেরি বাতেনি ময়লা সাফ করে, আমি আয়না হয়ে ফিরে যেতে হবে তাঁর কাছে। যেতে যেতে দেখব— আয়না আমি, আয়নাতে প্রতিবিম্বিত মুখও আমি।